এতিম ও বিধবার অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের নির্দেশনা
ছবিঃ সংগৃহীত
এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলাম, বিধবাকেও দিয়েছে মর্যাদা। ইসলাম আসার আগের যুগে সমাজে এতিম ও বিধবার অধিকার বলতে কিছুই প্রতিষ্ঠিত ছিল না। পিতার মৃত্যু হতে না হতেই অসহায় সন্তানেরা অত্যাচার, অবিচার ও জুলুম-নিপীড়নের শিকার হতো। অধিকার পাওয়া দূরে থাক, পিতা যে সম্পদ রেখে যেতেন তা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য উল্টো চক্রান্ত শুরু হয়ে যেত। নারীর বেলায়ও অবস্থা ছিল একই; স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর ফেলে যাওয়া সম্পত্তিতে তার কোনো অধিকার থাকত না।
পবিত্র কোরআনে এতিমদের মর্যাদা ও অধিকার প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘এতিমদের তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। খারাপ মালামালের সঙ্গে ভালো মালামালের অদলবদল কর না। আর তাদের ধনসম্পদ নিজেদের ধনসম্পদের সঙ্গে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস কর না। নিশ্চয় এটা বড়ই মন্দ কাজ।’ সুরা : নিসা, আয়াত ২।
আয়াতটি থেকে স্পষ্ট হয় যে এতিমের সম্পদ দখলে নেওয়া চলবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের সম্পত্তি তাদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া কর্তব্য, আর নিজের সম্পদের সঙ্গে সেটি একাকার করাও নিষেধ। অবশ্য উদ্দেশ্য ভালো হলে মিশিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
উদ্দেশ্য ভালো হওয়ার অর্থ হলো, এতিমের টাকা বা সম্পদ নিজের ব্যবসায় যুক্ত করে কারবার চালালে অর্জিত লাভ আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ বুঝে পাবে। এ রকম ব্যবস্থা অবশ্যই উত্তম, এমনকি তা সওয়াবের কাজও। যে এতিম ও বিধবার পক্ষে রোজগার করার মতো কেউ নেই, তাদের দান-অনুদান দেওয়া চালিয়ে যাওয়া এবং সহযোগিতা করা আবশ্যক। জাকাত, ফিতরা ও ব্যক্তিগত অনুদানের মাধ্যমে এতিম-বিধবাদের পাশে থাকার সুযোগ আমাদের রয়েছে।
এতিম ও বিধবাকে দান করতে হাদিসের গ্রন্থসমূহে ব্যাপক উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
রসুল (সা.) বলেন, বিধবা ও অসহায়দের তত্ত্বাবধানকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদকারীর মতো। এর অর্থ, অসহায় ও বিধবার সাহায্যে যারা এগিয়ে আসবে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার মতো সওয়াব তারা লাভ করবে। হাদিসটির বর্ণনাকারী সাহাবির ভাষ্য, তাঁর ধারণা আল্লাহর রসুল (সা.) এ-ও বলেছেন, বিধবা ও অসহায়দের তত্ত্বাবধানকারীর মর্যাদা ওই ব্যক্তির মতো, যে অলসতা না করে সারা রাত জেগে ইবাদত করে এবং ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন রোজা রাখে। বুখারি ও মুসলিম। যে ব্যক্তি বিধবা ও অসহায়দের সহযোগিতা করে এবং তাদের দায়িত্ব বহন করে, তার মর্যাদা ও ফজিলত তুলে ধরতে প্রিয় নবী (সা.) এ হাদিসে তিনটি সওয়াবের উল্লেখ করেছেন।
এক. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের সওয়াব। দুই. রাত জেগে নিয়মিত নফল নামাজ আদায়ের সওয়াব। তিন. নফল রোজা নিয়মিত পালনের সওয়াব। এতিম ও বিধবাদের সহযোগিতা ও সাহায্যের মাধ্যমে এই বিপুল সওয়াব অর্জনের সুযোগ আমাদের সামনে রয়েছে।
প্রিয় নবী (সা.) এতিমের প্রতি সহযোগিতা ও সাহায্যের ফজিলত বর্ণনায় আরও বলেন, আমি এবং এতিমের অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকব—এই কথা বলে তিনি হাতের শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দ্বারা ইশারা করলেন এবং উভয়ের মাঝে কিঞ্চিৎ ফাঁক রাখলেন। এর তাৎপর্য হলো, হাতের দুটি আঙুল যেমন একেবারে কাছাকাছি থাকে, জান্নাতে রসুল (সা.) এবং এতিমের অভিভাবকের অবস্থানও তেমনি একসঙ্গে হবে। (বুখারি শরিফ)
আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো এতিমের মাথায় হাত বুলাবে, যেসব চুলের ওপর দিয়ে তার হাত অতিক্রম করবে এর প্রতিটির বিনিময়ে তার জন্য সওয়াব লেখা হবে। আর যে ব্যক্তি তার তত্ত্বাবধানে লালিতপালিত এতিম বালক-বালিকার সঙ্গে ভালো আচরণ করবে, আমি ও সেই ব্যক্তি বেহেশতে এই দুটির মতো একত্রে থাকব।’ এই কথা বলে তিনি নিজ হাতের আঙুল দুটি মেলালেন। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি)। পৃথিবীর সেরা ঘর সেটিই, যেখানে এতিমের লালনপালন হয়।
বিশ্ব মানবতার মুক্তির অগ্রদূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ সম্পর্কে বলেন, ‘মুসলমানদের সেই ঘরটি সর্বোত্তম, যেখানে কোনো এতিম আছে এবং তার প্রতি ভালো ব্যবহার করা হয়। আর মুসলমানদের সেই ঘরটি সর্বাপেক্ষা মন্দ, যাতে কোনো এতিম আছে অথচ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়।’ ইবনে মাজাহ। এতিম ও বিধবাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসার তৌফিক মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের দিন।