হিলফুল ফুজুল থেকে মদিনার সনদ: শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)-এর ১০ পদক্ষেপ
ছবিঃ সংগৃহীত
অশান্ত পৃথিবীতে শান্তির শীতল হাওয়া বইয়ে দিতেই এসেছিলেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শান্তির বার্তা নিয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য সারা জীবন তাঁর সংগ্রাম ও সাধনা ছিল নিরন্তর। শৈশব, দুরন্ত কৈশোর, উদ্দীপ্ত তারুণ্য কিংবা জীবনের শেষ বেলা—সব সময় তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল একটাই।
এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)
শুরু থেকেই তিনি ছিলেন শান্তিপ্রিয়, কোমলহৃদয়, নীতিবান, সৎ ও বিশ্বস্ত। কৈশোরেই তাঁকে ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধি দেওয়া হয়। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও গোত্রীয় সম্প্রীতি রক্ষার জন্য তরুণ বয়সেই যোগ দেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামের শান্তিসংঘে। নবুওয়াত লাভের পরও যুগান্তকারী নানা পদক্ষেপে মরুর বুকে শান্তির এক স্নিগ্ধ পরিবেশ গড়ে তোলেন তিনি। তাঁর শান্তি প্রতিষ্ঠার উল্লেখযোগ্য ১০টি দিক এখানে তুলে ধরা হলো—
স্বার্থপরতা, সহিংসতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতিশোধের মনোভাব দমন করে সমাজে শৃঙ্খলা আনতে গঠিত হয়েছিল ‘হিলফুল ফুজুল’ নামের শান্তিসংঘ। তরুণ বয়সে প্রিয় নবী (সা.) এতে যোগ দেন এবং এর কার্যক্রম সফল করতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ২ / ৩৫৫; সিরাতে ইবনে হিশাম: ১ / ৮৭)
পৌত্তলিকতার অন্ধকারে ডুবে থাকা আরব সমাজ থেকে সব কুসংস্কার উপড়ে ফেলে তিনি এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাওহিদের আদর্শ সমাজ গড়েন। ইসলামের প্রথম যুগে ‘যুল-মাজাজ’ বাজারে তাঁর ঘোষণা ছিল—‘হে লোকসকল—বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাহলে তোমরা সফলকাম হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৯০০৪)
পাপ ও অজ্ঞতায় নিমজ্জিত আরববাসীকে আলোর পথ দেখিয়ে সাম্য, অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব আর বিশ্বমানবতার ভিত্তিতে তিনি এক উন্নত সমাজব্যবস্থা চালু করেন। জাহিলি যুগের বংশগৌরব ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ইনসাফ। সেই সমাজে গায়ের রং বা গোত্র নয়, ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতিই ছিল মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি। (হিলিয়াতুল আউলিয়া: ৩ / ১০; বায়হাকি, শুয়াবুল ইমান: ৫১৩৭)
তখনকার আরব সমাজে নারীকে দেখা হতো ভোগ্যপণ্য ও দাসী হিসেবে। কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জার বিষয় মনে করে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা চালু ছিল, বাবা বা স্বামীর সম্পত্তিতেও নারীর কোনো অধিকার ছিল না। প্রিয় নবী (সা.) এই নিষ্ঠুর প্রথার কঠোর প্রতিবাদ করেন এবং ইসলামে নারীর সামাজিক মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। (সুনানে নাসায়ি: ৩২৩২; মিশকাতুল মাসাবিহ: ৩০৮৩)
প্রাচীন আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে তুচ্ছ কারণে বিবাদ লেগেই থাকত। সামান্য অজুহাতে শুরু হতো দীর্ঘ যুদ্ধ; রক্তপাত আর লুটপাট ছিল তাদের নিত্যদিনের পেশা। এসব গোত্রীয় রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে প্রিয় নবী (সা.) শান্তিময় ভ্রাতৃত্বের এক সমাজ গড়ে তোলেন।
সে যুগে মদ্যপান ছিল আরবদের আভিজাত্যের প্রতীক। নর্তকীদের সঙ্গে নিয়ে মাতাল হয়ে তারা জঘন্য অশ্লীলতায় মেতে উঠত। জুয়াও ছিল তাদের সাধারণ অভ্যাস, যা প্রায়ই চরম হানাহানিতে গড়াত। মহানবী (সা.) কঠোরভাবে মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ করে সমাজকে অপরাধমুক্ত করেন। (মুসনাদে আহমাদ: ৪ / ২১৮)
প্রাচীন আরব ছিল নিষ্ঠুরতায় ভরা। দুর্বল মানুষ ও দাস-দাসীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাত শক্তিশালীরা। সমাজে ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রিয় নবী (সা.) মানুষের মধ্য থেকে সব ধরনের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা দূর করেন।
মদিনায় হিজরতের পর সেখানকার বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে গোষ্ঠীগত হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে সম্প্রীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রিয় নবী (সা.) যে যুগান্তকারী চুক্তি বা সংবিধান প্রণয়ন করেন, ইতিহাসে তা ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা এ দলিলকে বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বলা হয়।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ঘুচিয়ে সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত গড়তে তিনি ইসলামে জাকাতের বিধান চালু করেন। এতে দারিদ্র্য দূর করার পথ সহজ হয় এবং ধনী-গরিবের ফারাক কমানোর চমৎকার এক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়। (সুরা তওবা: ১০৩)
অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা কিংবা জোর করে কারও সম্পদ দখল করাকে তিনি পুরোপুরি হারাম ঘোষণা করেন। প্রত্যেক মানুষের জীবন ও সম্পদকে পবিত্র আমানত ঘোষণা করে তিনি সমাজে পরম শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ১৭৪১)
আজকের বিশ্ব যদি সব সংঘাত, বিবাদ আর অশান্তি থেকে মুক্তি পেয়ে প্রকৃত শান্তির সুবাতাস পেতে চায়, তবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রিয় নবী (সা.)-এর মহান আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা