ছবিঃ সংগৃহীত
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোয় বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস বেড়েছে, আর তার প্রভাবে পৃথিবীর পরবর্তী বরফযুগের সূচনা সম্ভবত আটকে গেছে। কানাডার আর্কটিক অঞ্চলের একটি বরফস্তর নিয়ে নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য মিলেছে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন, মানবজাতির জন্য একে সুখবর ভাবার সুযোগ নেই; বরং পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় মানুষের গভীর প্রভাবেরই প্রমাণ এটি।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণা বলছে, প্রায় ২০ হাজার বছর আগে বিশাল লরেনটাইড বরফস্তর আর্কটিক সার্কেল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, কোথাও কোথাও যার পুরুত্ব ছিল প্রায় দুই মাইল। সেই বরফস্তরের অবশিষ্ট অংশ হিসেবে এখন টিকে আছে কানাডার নুনাভুট অঞ্চলের বাফিন দ্বীপের বার্নস আইস ক্যাপ, আয়তনে যা যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের কাছাকাছি।
গবেষকেরা দেখেছেন, প্রায় তিন হাজার বছর আগে বার্নস আইস ক্যাপ সবচেয়ে ছোট আকারে নেমে আসে। পরে তাপমাত্রা কমতে থাকলে প্রায় দুই হাজার বছর আগে বরফস্তরটি আবার ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। গবেষকদের মতে, এই বিস্তারকে নতুন একটি হিমবাহ যুগ বা বরফযুগের প্রাথমিক সূচনা হিসেবে ধরা যেতে পারে।
কিন্তু ১৯৬০ সালের দিকে চিত্রটা নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। মানুষের কর্মকাণ্ডে তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় বরফস্তরটি আবার সংকুচিত হতে শুরু করে।
গবেষণার অন্যতম লেখক, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির ভূরসায়নবিদ নিকোলাস ইয়ং বলেন, নতুন বরফযুগের সূচনা হচ্ছিল, সব কিছু স্বাভাবিক নিয়মেই এগোচ্ছিল; কিন্তু হঠাৎ সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় মানুষ কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে, এটি তার জোরালো উদাহরণ।
বরফস্তর অতীতে কীভাবে এগিয়েছে-পিছিয়েছে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীরা বরফের নিচে চাপা পড়া প্রাচীন শ্যাওলা সংগ্রহ করে সেগুলোর বয়স নির্ণয় করেন। আশপাশের পাথরে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে জানার চেষ্টা করেন, সেগুলো কত দিন বরফমুক্ত ছিল। এসব তথ্য জুড়ে বরফস্তরের বিস্তার ও সংকোচনের ইতিহাস নতুন করে সাজানো হয়।
গবেষণার ব্যাখ্যা নিয়ে অবশ্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের অধ্যাপক মেরেডিথ কেলি গবেষণার পদ্ধতির প্রশংসা করলেও অন্য অঞ্চলের হিমবাহের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ দরকার বলে মনে করেন।
জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পদার্থবিদ আন্দ্রে গানোপোলস্কির মত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না হলেও পরবর্তী বরফযুগ শুরু হতে আরও প্রায় ৫০ হাজার বছর লাগতে পারত। তাই একটি বরফস্তরের বিস্তারকে নতুন বরফযুগের সূচনা বলার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই বলে মনে করেন তিনি।
১৯৭০-এর দশকে পৃথিবী নতুন বরফযুগের দিকে যাচ্ছে—কিছু বিজ্ঞানীর এমন ধারণা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছিল। নিউজউইক সাময়িকীর ‘দ্য কুলিং ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের প্রতিবেদনও তখন ব্যাপক আলোচিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সংশয়বাদীরা প্রায়ই সেই সময়ের পূর্বাভাসকে বিজ্ঞানীদের ভুলের উদাহরণ হিসেবে টেনে আনেন।
ইয়ং মনে করেন, নতুন গবেষণা সেই বিতর্ককে নতুনভাবে দেখার সুযোগ দিয়েছে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মানুষকে বরফযুগের বিপদ থেকে বাঁচিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ভুল হবে বলে সতর্ক করেন তিনি, কারণ বরফযুগের পরিবর্তন ঘটে হাজার হাজার বছর ধরে। বরং মানুষের কর্মকাণ্ড পৃথিবীর জলবায়ুব্যবস্থাকে কতটা বদলে দিয়েছে, গবেষণাটি সেই বাস্তবতাই সামনে আনে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে ভবিষ্যতে নতুন বরফযুগের সম্ভাবনাও দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে।
প্রেক্ষাপট
স্মিথসোনিয়ান সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণাটি ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয় ২২ অক্টোবর। সেখানে বলা হয়েছে, বার্নস আইস ক্যাপ সবচেয়ে ছোট আকারে পৌঁছেছিল প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর আগে; বরফস্তরটি কবে সবচেয়ে ছোট ছিল, সে বিষয়ে সূত্রভেদে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
সংখ্যার হিসাব
গিজমোডোর প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, জলবায়ু মডেলের হিসাবে আগামী ৩০০ বছরের মধ্যে বার্নস আইস ক্যাপ পুরোপুরি মিলিয়ে যেতে পারে।
এক নজরে
গবেষণার সহলেখক গিফোর্ড মিলার কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব আর্কটিক অ্যান্ড আলপাইন রিসার্চে; বিশ্ববিদ্যালয়টির ২২ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে বার্নস আইস ক্যাপ নিয়ে প্রথম যে গবেষণাগুলো হয়, তাতে হিমবাহটিকে প্রায় স্থিতিশীল দেখা গিয়েছিল।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: Smithsonian Magazine, অক্টোবর ২০২৬; Gizmodo, অক্টোবর ২০২৬; University of Colorado Boulder (INSTAAR), ২২ অক্টোবর ২০২৬