ছবিঃ সংগৃহীত
সার্বিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দর ভুচিচের দলকে ক্ষমতা থেকে হটানোর পর পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচার বিভাগসহ প্রশাসনের নানা স্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ চেয়েছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত রাজনৈতিক জোট। নতুন নেতৃত্ব দুর্নীতির তদন্ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার বেলগ্রেডে পার্লামেন্ট ভবনের উল্টো দিকের পায়োনিয়ার্স পার্কে এক সমাবেশে নবনির্বাচিত এমপিরা এ দাবি তোলেন। আইন ভাঙার অভিযোগ আছে এমন পুলিশ কর্মকর্তাদের এখনই বরখাস্তের আহ্বান জানান তাঁরা; বিশেষভাবে নাম আসে পুলিশপ্রধান, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা বিএআইয়ের প্রধান এবং সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের প্রধানের।
ভোটে জেতা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর ১৪১ জন এমপিকে দিয়ে সার্বিয়ার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজয়ী এই তালিকায় আছেন বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ এবং অন্তত ১২ জন চিকিৎসক ও সার্জন। তবে ক্ষমতা হস্তান্তর শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ লাগবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আশঙ্কা, এই ফাঁকে সম্ভাব্য অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ নষ্ট করে ফেলা হতে পারে।
ভুচিচ পরাজয় মেনে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেলগ্রেডের পায়োনিয়ার্স পার্ক থেকে তাঁর সমর্থকদের তাঁবু শিবির সরিয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার সকালে স্বেচ্ছাসেবকেরা পার্কটি পরিষ্কারে নামেন। এর আগে জায়গাটি ছিল ভুচিচের অনুগত সমর্থকদের অবস্থানস্থল।
পরিচ্ছন্নতার কাজে যোগ দেওয়া ২৫ বছরের মারিয়া মিলোভানোভিচ বলেন, ‘এটি বসন্তকালীন পরিচ্ছন্নতার প্রথম ধাপ মাত্র। এবার নতুনরা আসছে। আমরা খুবই উচ্ছ্বসিত, তবে এই কাজের জন্য প্রস্তুতও আছি।’
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূচনা ২০২৪ সালের নভেম্বরে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর পর। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার এবং এর পেছনে আছে বলে অভিযোগ ওঠা ব্যাপক দুর্নীতির তদন্ত চেয়ে তাঁরা আন্দোলন গড়ে তোলেন।
আন্দোলনকারীদের ঘোষিত ‘স্টুডেন্ট প্ল্যান’-এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট বন্ধের, আত্মসাৎ হওয়া সম্পদ রাষ্ট্রীয় বাজেটে ফেরানোর এবং শিক্ষা ও অর্থনীতিতে সরাসরি বিনিয়োগের। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএসে ভুচিচের অনুগত কর্মকর্তাদের সরানোর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে; প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মানিয়া গ্রিচিচ পদত্যাগ করেছেন।
নবনির্বাচিত এমপি মিরজানা নিকোলিচ বলেন, সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়ার অধিকার সার্বিয়ার নাগরিকদের আছে, অথচ বছরের পর বছর আরটিএস কাজ করেছে সরকারের স্বার্থে। টেলিকম সার্বিয়ার প্রধান ভ্লাদিমির লুচিচকেও পদ থেকে সরানোর উদ্যোগ নিতে চান নতুন এমপিরা।
ভুচিচের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট আনা ব্রনাবিচ অবশ্য এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা আইনের শাসনের বদলে ‘বিপ্লবী বিচার’ চালু করতে চায় এবং অপছন্দের গণমাধ্যমগুলো বন্ধের পরিকল্পনা করছে।
দ্রুত সংস্কার শুরুর ওপর জোর দিয়েছেন নতুন সরকারের পরিচিত মুখ এমপি দেজান শোশকিচ। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর ভাষ্য, প্রথম ছয় মাসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, আইন মেনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চালানো এবং লাস্ট্রেশন আইন প্রণয়ন তাঁর লক্ষ্য।
এই আইনে ভুচিচের সরকার বা দলীয় কাঠামোর সেই সদস্যদের সরকারি পদে থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে, যাঁরা সার্বিয়ার নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রমাণিত হবেন।
বেলগ্রেডভিত্তিক ইউরোপীয় পলিসি সেন্টারের গবেষক স্ট্রাহিনিয়া সুবোটিচ মনে করেন, প্রশাসন ও রাজনীতিতে ভুচিচ ও তাঁর দলের দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণের কারণে এমন পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে। তাঁর মতে, অতীতে যেসব প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশ কার্যকরভাবে কাজ করেছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই নতুন প্রশাসনকে এগোতে হবে।
সার্বিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ও গোপনীয় এক প্রক্রিয়ায় বিজয়ী ১৪১ প্রার্থীকে বেছে নিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের তৈরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন তাঁদের।
নানা মত ও পটভূমির শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই কর্মসূচি নিয়ে ঐকমত্য গড়তে কয়েক মাস লেগেছে। এখন তা বাস্তবায়নের ভার নবনির্বাচিত এমপিদের কাঁধে; শিক্ষার্থীরা নিজেরা সরাসরি ক্ষমতা চালাবেন না।
বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়নের অধ্যাপক ও স্টুডেন্ট লিস্টের সদস্য রাদোমির সাইচিচ বিবিসিকে বলেছেন, বাস্তবায়নের পদ্ধতি কাজ করতে করতেই ঠিক হবে, তবে নতুন এমপিরা শিক্ষার্থীদের তৈরি ১ হাজার ২০০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত পরিকল্পনা মেনে চলবেন। তাঁর কথায়, ‘সিদ্ধান্ত নেবে পার্লামেন্ট। তবে যেহেতু শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তাই আমরা তাঁদের মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেব এবং তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করব।’
রাজনীতিতে নতুন এই এমপিদের কোনো সুস্পষ্ট নেতাও নেই। ঘরের সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সার্বিয়ার জটিল কূটনৈতিক অবস্থান সামলানোর চ্যালেঞ্জও তাঁদের সামনে।
নতুন সরকারের শুরুর মনোযোগ অভ্যন্তরীণ সংস্কারে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পরের নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে হাতে সময় বেশি নেই; আগামী ডিসেম্বরে সার্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা।
আইন অনুযায়ী আলেক্সান্দর ভুচিচ তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে পারবেন না। তবে নির্বাচনে হেরে যাওয়া তাঁর দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি আবার রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফিরবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ভুচিচের ভাষায়, ‘তারা যতটা কল্পনাও করতে পারবে না, তার চেয়ে অনেক দ্রুত আমরা তাদের পরাজিত করব।’
প্রেক্ষাপট
মেদুজার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবরের আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়েছিলেন ভুচিচ; নির্বাচনে জিতলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
সংখ্যার হিসাব
দ্য ন্যাশনাল হেরাল্ডে প্রকাশিত এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুচিচ নিজেই জানান, তাঁর দল এসএনএস প্রায় ১৭ লাখ ভোট পেয়েছে, আর স্টুডেন্ট লিস্ট পেয়েছে প্রায় ২২ লাখ।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: Meduza, ২৬ অক্টোবর ২০২৬; The National Herald (AP), ২৬ অক্টোবর ২০২৬