৫ লাখ শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, ১৫ হাজার শ্রেণিকক্ষ: শিক্ষায় ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব
ছবিঃ সংগৃহীত
প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি—সব স্তরে পড়াশোনার মান বাড়াতে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে চায় সরকার। আইসিটি ও টেকনোলজি ল্যাব বসানো আর আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনাও আছে। সেই সঙ্গে নির্মাণ ও সংস্কার হবে ১৫ হাজারের বেশি শ্রেণিকক্ষ।
কাজগুলো হবে প্রস্তাবিত ‘নেক্সটজেন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রোগ্রাম’ প্রকল্পের আওতায়। প্রাথমিক হিসাবে এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। মাধ্যমিক স্তরে ৩ হাজার ৩৯৭ কোটির কিছু বেশি, মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরে ২ হাজার ৩৭৩ কোটি এবং প্রাথমিক স্তরে ২৮৮ কোটি টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আলাদা আলাদা প্রাথমিক খসড়া প্রকল্প প্রস্তাবে এসব তথ্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে, যদিও প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনুমোদন পেলে প্রকল্পগুলো প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার মানে বড় অগ্রগতি আনবে। কারণ বিপুলসংখ্যক শিক্ষক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ পাবেন। নতুন ভবন তোলার বদলে বিদ্যমান শ্রেণিকক্ষ ওপরের দিকে বাড়িয়ে ও সংস্কার করে ‘সক্রিয়’ শ্রেণিকক্ষে রূপ দেওয়া হবে—প্রকল্পের এটি একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
বিষয়টি নিয়ে গত বুধবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষার মান বাড়াতে বর্তমান সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ সংস্কার এবং অ্যাক্টিভ লার্নিং ক্লাসরুম তৈরির উদ্যোগ।
তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য দেশে কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে শিক্ষা লাভের পর কেউ বেকার না থাকে।’
সরকারের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৫ বলছে, দেশের ২৪ হাজার ১৪৭টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আছেন ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮ জন। ৯ হাজার ২৯৬টি মাদ্রাসায় শিক্ষক ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৫ জন, আর ২ হাজার ৭৪৮টি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ৩২ হাজার ৮৬৪ জন। তিন স্তর মিলিয়ে শিক্ষক ৬ লাখ ১০ হাজার ৬০৭ জন; পরিকল্পনা অনুযায়ী এঁদের প্রায় ৮২ শতাংশ প্রশিক্ষণ পাবেন।
মাউশির প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক শিক্ষার মান বাড়ানো এবং আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগসহনশীল শিখন-শেখানোর পরিবেশ গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতেও থাকবে নানা কার্যক্রম।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ড. সরদার মো. কেরামত আলী বলেন, ‘প্রকল্প প্রস্তাবগুলো বর্তমানে অনুমোদনের নানা ধাপে রয়েছে। বলা যায়, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এখনো চূড়ান্ত নয়।’
মাউশির খসড়া অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসকের জন্য দেশে ও বিদেশে পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
এ খাতে খরচ ধরা হয়েছে ৩৫৩ কোটি ৬০ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা। মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরে অন্তত ১ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে খরচ হবে ১০০ কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে বিভিন্ন স্তরে আরও ৩০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসককে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা আছে প্রস্তাবগুলোতে।
মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে মোট ২ হাজার ৮৫টি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ ও রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে—নির্বাচিত ৪৯৫টি মাদ্রাসায় ১ হাজার ৪৮৫টি এবং ২০০টি এসএসসি (ভোকেশনাল) বিদ্যালয়ে ৬০০টি। পাশাপাশি বসানো হবে ৬৯৫টি স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ ও ৬৯৫টি আইসিটি ল্যাব। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে থাকবে বিজ্ঞানাগার আর ডিজিটাল সুবিধাসহ শিক্ষকদের কমনরুম। কারিগরি শিক্ষার ১৪টি ট্রেডের জন্য তৈরি হবে ৫৭৬টি ডিজিটাল শিক্ষা কনটেন্ট।
মাধ্যমিক স্তরে ৩ হাজার শ্রেণিকক্ষ ওপরের দিকে সম্প্রসারণ এবং ৫ হাজার ২৫০টি শ্রেণিকক্ষকে জলবায়ুসহনশীল মাল্টিমিডিয়া ও সক্রিয় শিখন উপযোগী কক্ষে রূপান্তরের কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচিত ১ হাজার ৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি ল্যাব, ১ হাজার ৫০টি টেকনোলজি ল্যাব ও ১ হাজার ৫০টি ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং আসবাব সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক স্তরের জন্য প্রস্তাবে আছে সমন্বিত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষার্থীর দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন, শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থাভিত্তিক (জিআইএস) পরিবীক্ষণকে এক জায়গায় আনা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের এসব পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন শিক্ষাবিদেরা। তবে প্রশিক্ষণ যেন লোক দেখানো না হয় এবং সব কাজ যেন স্পষ্ট নীতিমালার আওতায় হয়, সেদিকে নজর দিতে বলেছেন তাঁরা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে এ প্রশিক্ষণ যেন নামকাওয়াস্তে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর অন্যান্য উন্নয়নও হতে হবে পরিকল্পিত। অর্থাৎ সব কার্যক্রমই সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় করতে হবে।’
প্রেক্ষাপট
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চলা ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ (লেইস) প্রকল্পে এরই মধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন শিক্ষকের প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ঠিক করা আছে; নেক্সটজেন প্রকল্প মাঠপর্যায়ে শুরু হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে — সরকারি শিক্ষক বাতায়নে প্রকাশিত বাসসের খবরে এ তথ্য রয়েছে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: শিক্ষক বাতায়ন (বাসস), অক্টোবর ২০২৬