মধুপুরে গারো-কোচ-বর্মণ জনগোষ্ঠীর দাবি লিখিতভাবে চাইলেন প্রযুক্তিমন্ত্রী
ছবিঃ সংগৃহীত
টাঙ্গাইলের মধুপুরের গারো, কোচ ও বর্মণ জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নে সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী আলহাজ্ব ফকির মাহবুব আনাম। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য তিনি এমন কিছু করতে চান, যাতে তাঁরা তাঁকে সারা জীবন মনে রাখেন বলেও জানান।
বুধবার মধুপুর (আবিমা) গড়াঞ্চলের গারো, কোচ ও বর্মণ জাতিগোষ্ঠীর উদ্যোগে পীরগাছা থাংয়ানি ক্রেডিট প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমস্যা ও প্রত্যাশাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা জরুরি, আর সে জন্য তাঁদের দাবি ও সমস্যার বিস্তারিত তথ্য লিখিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন, যাতে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ বের করা যায়।
আদিবাসী তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ফকির মাহবুব আনাম। একই সঙ্গে তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
মধুপুরের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় উন্নয়নের সম্ভাবনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জনগণের ভোট ও আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে তাদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে দাবি ও প্রত্যাশা সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে সমস্যাগুলো সমাধানে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার আশ্বাসও দেন তিনি।
এর আগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে আয়োজকরা তাঁদের প্রথাগত পদ্ধতিতে নেচে-গেয়ে মন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জন জেত্রার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন মধুপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন সরকার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র ও জাতি গোষ্ঠী দল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মৃগেন হাগিদক, অজয় এ মৃ, আদিবাসী যুব ও ছাত্র প্রতিনিধি জুয়েল রেটিং, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং গারো, কোচ ও বর্মণ জাতিগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ।
প্রেক্ষাপট
মধুপুরের বনাঞ্চলে ভূমি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। প্রথম আলোর ২৩ জুন ২০১৯-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনের আগে এ বন ছিল টাঙ্গাইলের পন্নীদের অধীনে, পরে তা নাটোরের মহারাজার জমিদারিভুক্ত হয় এবং ১৯৫০ সালে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হলে বাঙালি বসতি বাড়তে থাকে।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির এক গেজেটে অরণখোলা মৌজার ৯ হাজার ১৪৫ দশমিক ০৭ একর শালবনকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হলে গারো-অধ্যুষিত অনেক গ্রাম তার ভেতরে পড়ে যায়; রাষ্ট্র প্রথাগত ভূমি অধিকারকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় বন বিভাগ বাসিন্দাদের অবৈধ দখলদার গণ্য করে সময়ে সময়ে উচ্ছেদ নোটিশ দেয়।
সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি শুনানি শেষে টাঙ্গাইল বন আদালতের বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট মো. মিনহাজ উদ্দিন ফারাজী ৮৮টি বন মামলা প্রত্যাহার করে ২৩১ জন গারো ও কোচসহ মোট ৩৮৭ জন আসামিকে অব্যাহতি দেন; টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধুপুর জাতীয় উদ্যানে বসবাসকারীদের ঐতিহ্য ও অধিকার রক্ষাই এর উদ্দেশ্য — দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ৭ জানুয়ারি এ তথ্য জানিয়েছে।
সংখ্যার হিসাব
প্রথম আলোর ২৩ জুন ২০১৯-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধুপুরের ৪৪টি বনগ্রামে পরিচালিত এক জরিপে ১১ হাজার ৪৮টি পরিবারের ৪৭ হাজার ৭২৬ জন বাসিন্দার মধ্যে বাঙালি ছিলেন ৬৪ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং গারো ৩৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ — অর্থাৎ নিজেদের ঐতিহাসিক আবাসভূমিতেই গারোরা এখন সংখ্যালঘু।
ওই জরিপে আরও দেখা যায়, বসতভিটার সিএস বা আরওআর রেকর্ড রয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ গারো পরিবারের, বাঙালি পরিবারের ক্ষেত্রে যা ১৩ শতাংশ।