ছবিঃ সংগৃহীত
কেপটাউনের বল-টেম্পারিং কাণ্ডে স্যান্ডপেপারের ব্যবহার অস্ট্রেলিয়া দলের সবারই জানা ছিল—ঘটনার আট বছরের বেশি সময় পর এমন দাবি করেছেন দেশটির সাবেক বাঁহাতি ব্যাটার উসমান খাজা। তাঁর ভাষ্য, এর আগে পোর্ট এলিজাবেথে (গেবেরহা) হওয়া টেস্টেও স্যান্ডপেপার (ঘষে মসৃণ করার শিরিষ কাগজ) কাজে লাগানো হয়েছিল।
খাজার এ দাবি মেলে না ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার চার বোলার মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়নের যৌথ বিবৃতির সঙ্গে। বল বিকৃতির কথা তাঁরা জানতেন—এমন অভিযোগ ওই বিবৃতিতে অস্বীকার করেছিলেন চারজন।
সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খাজা বলেছেন, ‘আমরা সবাই জানতাম। শুধু ব্যাটার বা বোলার বা সাপোর্ট স্টাফ নয়, আমরা সবাই।’ শিগগিরই প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা তাঁর আত্মজীবনী ‘সবর’-এও বিষয়টি বিস্তারিত এসেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউন টেস্ট চলার সময় ওপেনার ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে প্যান্টের ভেতর ছোট এক টুকরা স্যান্ডপেপার লুকাতে দেখা যায়। এরপর অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ প্রকাশ্যে মেনে নেন, দলের ‘নেতৃত্বস্থানীয় গোষ্ঠী’ (লিডারশিপ গ্রুপ) বল বিকৃতির পরিকল্পনা করেছিল। শাস্তি হিসেবে স্মিথ ও সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার ১২ মাস নিষিদ্ধ হন, ব্যানক্রফট পান নয় মাসের নিষেধাজ্ঞা। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে কোনো নেতৃত্বের পদে থাকার ওপর স্মিথকে আরও ১২ মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
ওয়ার্নারের ওপর জারি হয়েছিল আজীবন অধিনায়কত্বের নিষেধাজ্ঞা। ২০২৪ সালে তা তুলে নেওয়ার পরপরই সিডনি থান্ডারের অধিনায়ক করা হয় তাঁকে। খাজা জানান, ড্রেসিংরুমে তিনি সবার কাছে আহ্বান রেখেছিলেন, কেবল স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটকে বলির পাঁঠা না বানিয়ে পুরো দল যেন দায় নেয়।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী খাজা বলেছেন, আদর্শ পরিস্থিতিতে তিনি এমনটা করতে চাইতেন না; সামনে এসে সত্য ফাঁস করবেন, এমন কেউ হতেও চাননি। সমস্যা হলো, তিনি সত্যিই ভেবেছিলেন আট বছর পেরোনোর পর এত দিনে সত্যটা সবার সামনে চলে আসবে। হয়তো ডেভি (ডেভিড ওয়ার্নার) বিষয়টি প্রকাশ করবেন, কিংবা অন্য কেউ এ নিয়ে আরও কথা বলবেন—এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এ জায়গায় গড়াবে, তা কখনো ভাবেননি। তবে বিষয়টি যেভাবে দীর্ঘায়িত হয়েছে, তাতে এর দায় সম্মিলিতভাবে নেওয়া উচিত বলে মত তাঁর।
উসমান খাজা জানান, ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি বলেছিলেন, ‘পুরো দল মিলে এর দায় নাও’। তাঁর যুক্তি, কাজটা দল হিসেবেই করা হয়েছিল; কী ঘটছে তা সবাই জানতেন, তাই দায়ও দলেরই নেওয়া উচিত। শুরু থেকেই এ অবস্থানে ছিলেন তিনি। বাস্তবে অবশ্য তা হয়নি, উল্টো ওই তিনজনকে কঠোরভাবে কোণঠাসা করে ফেলা হয়।
মুখ খোলার কারণ হিসেবে খাজা বলেন, তাঁর মনে হয়েছে ‘এটিই সঠিক কাজ’। স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি; তাঁর মতে, ঘটনার পরের বছরগুলোতেও এই পরিণতির ভার বয়ে বেড়াতে হয়েছে তিনজনকে। এই অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার বলেন, তিনি সব সময় মনে করেন জীবনের পরিসর ক্রিকেটের চেয়ে অনেক বড়। এক অর্থে এই খেলোয়াড়েরা ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু কেউ তাঁদের সেই ন্যায়বিচার দেবে বলে মনে হচ্ছে না। আর ওই তিনজনের কেউই নিজে থেকে প্রথমে কিছু বলতে চাইছেন না।
টেস্টের পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একটি তদন্ত শুরু করে, যার ফলে তিন খেলোয়াড় বিভিন্ন মেয়াদের নিষেধাজ্ঞা পান। তবে বোর্ড তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে না ডাকায় অবাক হয়েছিলেন বলে জানান খাজা। তিনি বলেন, পুরো টেস্টজুড়ে তিনি ক্যাম ব্যানক্রফটের পাশেই বসে ছিলেন, অথচ তাঁকে সাক্ষাৎকার দিতে ডাকা হয়নি। খাজার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি বিষয়টি দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরবেন—এটা জানত বলেই তাঁকে ডাকা হয়নি; সাক্ষাৎকার দিলে তিনি যে সত্যটাই বলে দেবেন, তা-ও তারা জানত।
খাজা জানিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল। বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের সঙ্গে নিজের বই নিয়ে কথা বলেছিলেন তিনি, জানিয়েছিলেন বল-টেম্পারিং কাণ্ড নিয়ে বইয়ে খোলামেলা আলোচনা থাকছে।
অ্যাশেজ সিরিজের পর এ বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান সাবেক এই ওপেনার। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাঁর লেখা পড়লে দেখা যাবে, তিনি বারবার বলেছেন এটি ‘আমাদের’, অর্থাৎ পুরো দলের বিষয়; দায়টা কেবল স্টিভ, ডেভি (ডেভিড ওয়ার্নার) বা ব্যাঙ্গার্সের (ক্যাম ব্যানক্রফট) নয়, সবার। দিন শেষে কাজটা সঠিক ছিল বলেই তাঁর মনে হয়, বিশেষ করে ওই তিনজনের জন্য। তাঁর ধারণা, দলের বেশির ভাগ সদস্য কোনো না কোনোভাবে স্বস্তি পাবেন যে অবশেষে বিষয়টি পেছনে ফেলে সামনে এগোনো যাচ্ছে।
প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালের ঘটনার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্তে স্যান্ডপেপার ব্যবহারের পরিকল্পনা সম্পর্কে অন্য কোনো খেলোয়াড়ের জানা থাকার তথ্য মেলেনি, এবং বোর্ড বরাবর এ অবস্থানেই থেকেছে — অস্ট্রেলীয় বার্তা সংস্থা এএপির প্রতিবেদনটি ক্যানবেরা টাইমস অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশ করেছে।
এক নজরে
ক্রিকট্র্যাকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাজার আত্মজীবনীর পুরো নাম ‘সবর: ফাইন্ডিং মাই ওয়ে ইন ক্রিকেট অ্যান্ড লাইফ’; পেঙ্গুইন বুকস অস্ট্রেলিয়া থেকে ৪৪৮ পৃষ্ঠার বইটি ১০ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশের কথা। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে দল রওনা হওয়ার আগেই খাজা অধিনায়ক কামিন্স ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গকে বইয়ে স্যান্ডপেপার কাণ্ড নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায় থাকার কথা জানিয়েছিলেন বলে একই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রেক্ষাপট সূত্র: ক্যানবেরা টাইমস (এএপি), অক্টোবর ২০২৬; ক্রিকট্র্যাকার, অক্টোবর ২০২৬

