ছবিঃ সংগৃহীত
পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক যাত্রা বড় রকমের হোঁচট খায় তখনই, যখন ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জেরে সংবিধান বাতিল হয়, রাজনীতিকেরা গ্রেপ্তার হন এবং রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দেওয়া হয় সেনাবাহিনীর হাতে। সামরিক শাসন ঘোষণা করেছিলেন ইস্কান্দার মির্জা, অথচ সেই শাসনই শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়। জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পর দেশটিতে সামরিক কর্তৃত্বের এক দীর্ঘ ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পাকিস্তানের রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামোয় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১১ বছরের মাথায়, দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সেদিন প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা সংবিধান বাতিল ও পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি সামরিক আইন জারি করেন। সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমও একই সঙ্গে নিষিদ্ধ হয়। পরে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বহু রাজনীতিক গ্রেপ্তার হন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর সম্ভাবনা এভাবে কার্যত থমকে যায়।
ক্ষমতা দখলের এই পরিকল্পনায় মির্জার সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান। আইয়ুব পরে তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা ১৯৫৪ সাল থেকেই তাঁর রাজনৈতিক ভাবনায় জায়গা করে নিয়েছিল। সে সময় সেনাপ্রধান থাকার পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। যে রাজনীতিকেরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের অবজ্ঞার চোখে দেখতেন মির্জা ও আইয়ুব দুজনই।
পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ১৯৫৯ সালের শুরুর দিকে। ওই নির্বাচন হলে প্রতিবেশী ভারতের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে এগোনোর সুযোগ পেতে পারত দেশটি। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার রাজনীতিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তৈরি ছিলেন না ক্ষমতালোভী মির্জা ও আইয়ুব। অথচ ১৯৫৬ সালে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় নয় বছর পর, দেশটি একটি সংবিধান পেয়েছিল; হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খুরোসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার প্রচেষ্টায় সেটি প্রণীত হয়। সংসদীয় সরকারব্যবস্থার ভিত গড়ে ওঠে ওই সংবিধানের মধ্য দিয়েই।
তারও আগে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের জায়গায় আসেন ইস্কান্দার মির্জা। ১৯৫৬ সালের সংবিধান কার্যকর হলে তিনি শপথ নেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। সংবিধানটি প্রণীত হয়েছিল ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধারার আদলে, আর তাতে ছিল সংসদীয় শাসনব্যবস্থার কথা। আশা করা হয়েছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা পেলে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মজবুত হয়ে উঠবে।
অথচ যে সংবিধানের ভিত্তিতে মির্জা প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর তিনি নিজেই সেটি বাতিল করে দেন। এ সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা, দর-কষাকষি ও সমঝোতার ভেতর দিয়ে যে সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, একটি ঘোষণাতেই তা ধসে পড়ে।
সামরিক আইন জারি করে ইস্কান্দার মির্জা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে নিয়োগ দেন জেনারেল আইয়ুব খানকে। ক্ষমতার এক নির্মম পরিহাস লুকিয়ে ছিল এ সিদ্ধান্তে। নিজের অবস্থান পোক্ত করতে চেয়ে মির্জা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে টেনে আনেন এমন এক সেনাপ্রধানকে, যাঁর হাতেই অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি ঘটবে।
ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে দক্ষতা ছিল মির্জা ও আইয়ুব দুজনেরই। তবে আইয়ুবের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক কৌশলের সামনে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় মির্জাকে।
সামরিক শাসন জারির পর মির্জার গঠিত মন্ত্রিসভায় জায়গা পান জুলফিকার আলী ভুট্টো—লারকানার তরুণ আইনজীবী, যিনি বিদেশে শিক্ষিত। ভুট্টো ছিলেন মির্জার ছেলে হুমায়ুন মির্জার বন্ধু। মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রেসিডেন্টকে চিঠি লেখেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, এমন একটি মন্তব্যও ছিল সেই চিঠিতে। ভুট্টোর ধারণা ছিল, ইতিহাস মির্জাকে স্মরণ করবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চেয়েও মহান ব্যক্তি হিসেবে।
তবে সামরিক শাসন ঘোষণার পরবর্তী ২০ দিনে মির্জা ও আইয়ুবের ক্ষমতার টানাপোড়েন ক্রমে বেড়ে চলে। আইয়ুব একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান—এটি তখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। এদিকে সেনাবাহিনীর ভেতরে আইয়ুব ও তাঁর অনুগত কর্মকর্তারা মির্জাকে সরানোর পরিকল্পনা আঁটছিলেন। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট কতটা অজ্ঞ ছিলেন, পরের ঘটনাপ্রবাহেই তা ধরা পড়ে।
আইয়ুবের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা—যাঁদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল বুরকি, কে এম শেখ, মুসা ও ইয়াহিয়া খান—মনে করতেন, একটি রাষ্ট্রে দুই ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা থাকা চলে না। তাই মির্জাকে সরানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
করাচিতে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়; ইয়াহিয়া খানও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। বন্দুকের মুখে সেখানে মির্জাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। পরে দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদ মির্জাসহ তাঁকে বিমানে তুলে কোয়েটায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নাহিদ এর আগে তেহরানে পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত একজন ইরানি নৌ-কর্মকর্তাকে বিয়ে করেছিলেন। কয়েক দিন বাদে মির্জা ও নাহিদকে নির্বাসনে পাঠানো হয় লন্ডনে। পাকিস্তানে আর ফিরতে পারেননি মির্জা; বাকি জীবন তাঁর কেটেছে বিদেশেই।
পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ২৭ অক্টোবর থেকে আইয়ুব খানের করায়ত্ত হয়। প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক—দুই দায়িত্বই তিনি একসঙ্গে নেন। নতুন মন্ত্রিসভায় কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তি থাকলেও প্রাধান্য ছিল সামরিক কর্মকর্তাদের। দ্রুত অবস্থান বদলে আইয়ুবের প্রতি আনুগত্য জানান তরুণ ভুট্টোও। ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা যে পরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এ ঘটনায় তার প্রাথমিক আভাস মেলে।
আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায় পাকিস্তানের বিচার বিভাগকেও। ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ বা ডকট্রিন অব নেসেসিটি প্রয়োগ করে প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ মুনিরের নেতৃত্বাধীন উচ্চ আদালত সামরিক শাসন ও ক্ষমতা দখলকে আইনি বৈধতা দেওয়ার পথ করে দেয়। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত পরে একটি বিতর্কিত দৃষ্টান্তে পরিণত হয়।
একই ধরনের বিতর্কের কেন্দ্রে বিচারপতি মুনির আগেও ছিলেন। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৪ সালে গণপরিষদ ভেঙে দিয়েছিলেন, আর স্পিকার মৌলভি তমিজউদ্দিন খান তার বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ করেন। মুনিরের নেতৃত্বাধীন আদালত অবশ্য সে চ্যালেঞ্জ খারিজ করে দেয়। ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ সে সময়ও কাজে লাগানো হয়েছিল।
এর চার বছর পর আইয়ুবের ক্ষমতা দখলের বেলাতেও বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একই। আইয়ুবের ক্ষমতা গ্রহণকে মুনির তুলনা করেছিলেন ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের সঙ্গে। অথচ ওই বিপ্লবগুলোর ঐতিহাসিক চরিত্র আর পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল এক জিনিস ছিল না। বিচার বিভাগের এ অবস্থানের ফলে সাংবিধানিক শাসন নয়, বরং সামরিক কর্তৃত্ব শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ক্ষমতায় বসামাত্র আইয়ুব খান পাকিস্তানকে বানিয়ে ফেলেন নিজের রাজনৈতিক পরীক্ষাগার। তাঁর সরকার ১৯৫৯ সালে জারি করে ইলেকটিভ বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডিন্যান্স বা ইবিডিও, যার মাধ্যমে রাজনীতিকদের একটি বড় অংশকে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা হয়। তাঁর শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্যই ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
আইয়ুব নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেন, যদিও কোনো যুদ্ধে বিশেষ বীরত্ব দেখানোর প্রেক্ষাপট তাঁর ছিল না। তাঁর শাসনের প্রথম চার বছরে পাকিস্তান চলেছে সরাসরি সামরিক আইনের অধীনে।
১৯৬২ সালে নতুন সংবিধান প্রণীত হলে সামরিক আইন তুলে নেওয়া হয়, তবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাতে প্রতিষ্ঠা পায়নি। আইয়ুব ওই সংবিধান দিয়ে নিজের ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। সর্বজনীন ভোটাধিকার না রেখে নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা হয় মাত্র ৮০ হাজার সদস্যের একটি নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে।
‘বেসিক ডেমোক্র্যাটস’ নামে পরিচিত ছিলেন এই নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যরা। প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ নিতেন তাঁরাই। একটি জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি প্রাদেশিক পরিষদ গঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান কার্যকারিতার দিক থেকে ছিল সীমিত। গভর্নরদের নিয়োগ দেওয়া ও সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও কেন্দ্রীভূত ছিল প্রেসিডেন্টের হাতে।
এর ফলে আইয়ুবের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে প্রাদেশিক প্রশাসনও। জেনারেল আজম খান ও গোলাম ফারুকের মতো ব্যক্তিদের পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োগ ও অপসারণেও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়।
আবদুল মোনেম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। স্বল্পপরিচিত এই বাঙালি আইনজীবী ছিলেন আইয়ুবের ঘনিষ্ঠ সমর্থক। পশ্চিম পাকিস্তানে গভর্নরের দায়িত্বে বেশ কয়েক বছর ছিলেন কালাবাগের নবাব মালিক আমির মোহাম্মদ খান। তাঁর জায়গায় পরে আসেন জেনারেল মোহাম্মদ মুসা, যিনি সেনাপ্রধানের পদ থেকে অবসর নিয়েছিলেন। নবাব পরবর্তী সময়ে নিজের এক ছেলের হাতে নিহত হন। পারিবারিক বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে—এমনটাই প্রচার করা হয়েছিল।
নিজেকে বেসামরিক রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় মুসলিম লীগকে ভাগ করেন আইয়ুব খান। দলের একটি অংশ নিয়ে গড়ে তোলেন কনভেনশন মুসলিম লীগ। এভাবে তিনি নিজস্ব একটি রাজনৈতিক সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করেন; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় রাজনীতির ওপরও প্রতিষ্ঠা করেন নিয়ন্ত্রণ।
আইয়ুবের দশ বছরের শাসনে পাকিস্তানে যে বেসামরিক-সামরিক ক্ষমতাকাঠামো দাঁড়িয়ে যায়, তাতে দুর্বল হয়ে পড়ে রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের একাংশ ও সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের তোষামোদেও তাঁর শাসন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। উল্লেখ করা হয়, ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বা ‘প্রভু নয়, বন্ধু’ নামের তাঁর স্মৃতিকথাটি লেখানো হয়েছিল অন্যের হাত দিয়ে।
মোহাম্মদ আলী বগরা ১৯৬৩ সালে মারা গেলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান জুলফিকার আলী ভুট্টো। আইয়ুব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে রাজনীতিতে তাঁর উত্থান ঘটতে থাকে দ্রুতগতিতে।
আইয়ুব ও ভুট্টোর নেতৃত্বে ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায় পাকিস্তান। সে যুদ্ধের পরিণতিতে চাপে পড়ে দুই দেশই। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে তাসখন্দ ঘোষণায় প্রাথমিকভাবে স্বাক্ষর করেন আইয়ুব খান।
তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ ঘোষণা ঘিরে বিতর্ক দেখা দেয়। ঘোষণায় একটি ‘গোপন ধারা’ আছে—এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে থাকেন ভুট্টো। অল্প দিনের ব্যবধানে তিনি সরকার ছাড়েন। যে আইয়ুব খানের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় একসময় তাঁর উত্থান, প্রচার শুরু করেন তাঁরই বিরুদ্ধে।
ভুট্টোর এভাবে অবস্থান বদলানো পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক। আইয়ুবের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মধ্যে ছিল ক্ষমতাসীনদের প্রতি তাঁর আনুগত্যের পরিচয়; আর পরে সরকারের বিরোধিতায় নামা প্রশস্ত করে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথ।
পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আইয়ুব খানের শাসনামলে ধীরে ধীরে জোরালো হতে থাকে। ভাষা আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চনা আর কেন্দ্রীয় শাসনের কর্তৃত্ববাদী আচরণে বাঙালির ক্ষোভ বেড়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান।
আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে শেখ মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে। মামলাটি দিয়ে মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করাই ছিল সরকারের লক্ষ্য।
বাস্তবে ঘটে তার বিপরীত। পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দেয় আগরতলা মামলা। জনসমর্থন বাড়তে থাকে শেখ মুজিবের প্রতি, আরও বিস্তৃত হয় স্বায়ত্তশাসনের দাবির আন্দোলন। তাঁকে রাজনীতি থেকে সরানোর পরিকল্পনায় যে মামলা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই আইয়ুববিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করে তাঁর পতনের রাস্তা খুলে দেয়।
সমর্থকেরা আইয়ুবকে এশিয়ার চার্লস দ্য গলের সমতুল্য নেতা হিসেবে দেখাতে চাইতেন, আর তাঁর শাসনকালকে অভিহিত করা হতো ‘উন্নয়নের দশক’ নামে। তবে উন্নয়নের এ প্রচারণার আড়ালে গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতার জবাবদিহি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল দুই পাকিস্তানেই। পূর্ব পাকিস্তানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ বিশেষভাবে তাঁর শাসনের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমে দুর্বল করে ফেলে।
গভীর রাজনৈতিক সংকট আইয়ুব খানকে ঘিরে ধরে ১৯৬৯ সালের শুরুতে। আগরতলা মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হন তিনি। রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রণ পান শেখ মুজিবুর রহমান। খান আবদুল ওয়ালি খান ও ভুট্টোকে এর আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু আন্দোলনের চাপে মুক্তি দিতে হয় তাঁদেরও।
সামরিক শক্তি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা আইয়ুবের শাসনব্যবস্থা যে গণআন্দোলনের মুখে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে, এসব ঘটনায় তা পরিষ্কার হয়ে যায়।
১৯৬৯ সালের মার্চে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন আইয়ুব খান। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরেও গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা তিনি রক্ষা করেননি। ১৯৬২ সালের সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল জাতীয় পরিষদের স্পিকার আবদুল জব্বার খানের। আইয়ুব সে পথে না গিয়ে ক্ষমতা তুলে দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে।
ক্ষমতা নিয়েই ইয়াহিয়া খান ফের সামরিক আইন জারি করেন। ফলে পাকিস্তানে গণতন্ত্র নয়, বহাল থাকে সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা। একজন সামরিক শাসক বিদায় নেওয়ার পর আরেকজনের আগমন থেকে প্রমাণ মেলে, কেবল ব্যক্তি পরিবর্তন পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের মূলে ছিল না; মূলে ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর প্রভাব আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায় ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল। মির্জার নির্বাসিত জীবন কাটে লন্ডনে, যেখানে শেষ পর্যন্ত তাঁকে একটি রেস্তোরাঁয় ব্যবস্থাপকের কাজ করতে হয়। তবু নিজ দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখে গেছেন তিনি।
লন্ডনেই ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে মারা যান মির্জা। তাঁর মরদেহ পাকিস্তানে সমাহিত করার অনুমতি অবশ্য ইয়াহিয়া খান দেননি। পরিবারের সদস্যরা তাই তাঁকে দাফন করেন তেহরানে।
আর আইয়ুব খানের মৃত্যু হয় ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে, অনেকটাই বিস্মৃত ও উপেক্ষিত অবস্থায়। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছিলেন; অথচ সে ক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে স্থায়িত্ব দিতে পারেনি।
পাকিস্তানের ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রবণতার শুরু ১৯৫৮ সালের অক্টোবরের সামরিক অভ্যুত্থান থেকে। এরপর আরও তিন দফায় সামরিক শাসন দেখেছে দেশটি—জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল জিয়াউল হক ও জেনারেল পারভেজ মোশাররফের শাসনামলে।
ক্ষমতা দখলের দুই বছর পর আইয়ুব খান নিজেই নিজেকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করেছিলেন। আর পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত হয়েছেন জেনারেল আসিম মুনির; এ উদ্যোগ নিয়েছে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট বেসামরিক সরকার।
সামরিক বাহিনীর বারবার ক্ষমতা গ্রহণ, সংবিধানের স্থগিতকরণ এবং বেসামরিক রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ—পাকিস্তানের ইতিহাসের এসব ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে: গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হলে তাতে কি দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়?
১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনা ও তার পরের রাজনৈতিক পরিণতি থেকে দেখা যায়, সামরিক শক্তি দিয়ে ক্ষমতা সাময়িকভাবে সংহত করা গেলেও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, সাংবিধানিক শাসন ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার তাতে গভীর সংকটে পড়তে পারে। সেই সংকটেরই ধারাবাহিক প্রতিফলন পাকিস্তানের পরবর্তী ইতিহাস।