মা-মেয়ে মিলে আয়ের আশা কলেজছাত্রী মিতুর, পাশে বসুন্ধরা শুভসংঘ
ছবিঃ সংগৃহীত
তিন মাসের সেলাই প্রশিক্ষণ শেষ করে সেলাই মেশিন হাতে পেয়েছেন নেত্রকোনা সদর ও বারহাট্টা উপজেলার ৪০ জন অসচ্ছল নারী। তাঁদের স্বাবলম্বী করে তুলতে পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। অভাব-অনটনের সংসার থেকে বেরিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন অনেক নারীই দেখেন; কিন্তু কাজের দক্ষতা ও ইচ্ছা থাকার পরও আর্থিক সংকটে তাঁদের অনেকের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় না। মেশিন পাওয়া এই নারীরা এখন স্বপ্ন দেখছেন, ঘরে বসে আয় করে নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্য বদলাবেন।
তাঁদেরই একজন বারহাট্টা উপজেলার মাহামুদা আক্তার; মেশিন পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তিনি। বসুন্ধরা শুভসংঘের উদ্যোগে তিন মাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর মেশিনটি হাতে নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘সেলাই মেশিনটি আমার কাছে নতুন করে বাঁচার সুযোগ। এখন ঘরে বসে সেলাই করে কিছু আয় করতে পারব। আশা করছি, আমার সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারব। এই সহযোগিতার জন্য বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রতি আমি অনেক কৃতজ্ঞ।’
সম্প্রতি বারহাট্টা উপজেলার মাল্টিপারপাস হলরুমে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে মাহামুদা ছাড়াও প্রশিক্ষণ শেষ করা আরও ১৯ জন অসচ্ছল নারীকে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়। মেশিনগুলো তাঁদের হাতে তুলে দেন ইমদাদুল হক মিলন, যিনি দুই বাংলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রধান ও বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা। অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিনা আক্তার, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এ এস এম গোলাম হোসাইন, ওসি (তদন্ত) শফিকুজ্জামান, প্রেস ক্লাবের সভাপতি শামসউদ্দীন আকন্দ বাবুল, ধর্মপাশা প্রেস ক্লাবের সভাপতি সেলিম আহম্মেদ, অখিল চন্দ্র পাল, মো. নুরুল আমিন, ফেরদৌস আহম্মদ, মোখলেছুর রহমান প্রমুখ।
সেলাই মেশিন বিতরণের উদ্দেশ্য তুলে ধরে অনুষ্ঠানে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘সেলাই মেশিন দেওয়ার পেছনে আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটিই—যেসব নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, স্বাবলম্বী হতে চান, কিন্তু অর্থের অভাবে সেলাই মেশিন কিনতে পারেন না, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো। বসুন্ধরা শুভসংঘ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিতভাবে সেলাই মেশিন বিতরণ করছে। আমরা চাই, এই মেশিন একজন নারীর হাতে শুধু একটি যন্ত্র হিসেবে না থাকুক, এটি হোক তাঁর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি পথ।’
উদ্যোগটি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিনা আক্তারের মন্তব্য, ‘অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে সেলাই মেশিন বিতরণের এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন মাস প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের হাতে শুধু একটি মেশিন তুলে দেওয়া হচ্ছে না, বরং তাঁদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।’
তাঁর ভাষায়, ‘এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারীরা ঘরে বসেই কাজ করে আয় করতে পারবেন এবং পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারবেন। বসুন্ধরা গ্রুপের এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরে আমি আনন্দিত।’
এদিকে আরও ২০ জন নারী সেলাই মেশিন পেয়েছেন নেত্রকোনা সদর উপজেলায়, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের কার্যালয়ে। সেখানকার অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও প্রাবন্ধিক হায়দার জাহান চৌধুরী, নেত্রকোনা জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামলেন্দু পাল, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের ব্যবস্থাপক মৃণাল কান্তি চক্রবর্তী, বসুন্ধরা শুভসংঘ নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি আব্দুর রহমান, বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি আলপনা বেগম, নিউজ২৪-এর প্রতিনিধি সোহান আহমেদ কাকন, কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি এবাদ হোসেন এবং শুভসংঘের সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম টনি প্রমুখ।
মেশিন পাওয়াদের মধ্যে আছেন মিতু আক্তার, যাঁর বাবা নেই। তাঁদের সংসার চলে মায়ের আয়ে; বিভিন্ন টেইলার্সে ঘুরে সেলাইয়ের কাজ করে সেই আয় করেন মা। নেত্রকোনা সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিতু। মায়ের পাশাপাশি নিজেও কাজ করে পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে চান তিনি।
মিতুর কথায়, ‘বাড়িতে সেলাই মেশিন থাকলে মা-মেয়ে দুজনেই কাজ করে ভালো আয় করতে পারব। বসুন্ধরার সহায়তায় প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন পেয়েছি। এখন আমাদের সচ্ছলতা আসবে, ইনশাআল্লাহ। অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই বসুন্ধরা গ্রুপকে।’
নতুন করে আশার আলো দেখছেন মেশিন পাওয়া আরেক নারী ইতি রানী দাসও। ঢাকার একটি গার্মেন্টসে স্বল্প বেতনে কাজ করেন তাঁর স্বামী। সেই সীমিত আয়ে সংসারের সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ইতি নিজেও কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘের দেওয়া সেলাই মেশিন।
প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উপকরণ—দুটোই বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ থেকে পেয়েছেন ৪০ নারী। এখন নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা। সেলাইয়ের কাজ করে পরিবারের আর্থিক সংকট কমানো এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ায় ভূমিকা রাখা—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।