‘ধীরগতির সুনামি’—ব্যাংককে এআই নিয়ে উদ্বেগ আর আশার কথা শোনালেন অর্থনীতির নেতারা
ছবিঃ সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা, সেই সঙ্গে তৈরি হয়েছে তীব্র কৌতূহল। একদিকে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি করছে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর শঙ্কা। প্রযুক্তি খাতের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে ধীরগতির সুনামি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কণ্ঠে উঠে এসেছে এআই নিয়ে নানা পূর্বাভাস ও উদ্বেগের কথা।
আইএমএফপ্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানান, জ্বালানিসংকটের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা ভাব থাকলেও এআই অবকাঠামোয় বিশাল বিনিয়োগের কারণে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের আশপাশে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। এআইয়ের এই বিকাশ উন্নত এশীয় অর্থনীতিগুলোতে প্রবৃদ্ধি অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ এবং উদীয়মান এশীয় দেশগুলোতে শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে এই অর্জনের মুদ্রার অন্য পিঠটি বেশ উদ্বেগজনক। আইএমএফের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি এআই দিয়ে প্রভাবিত হবে—অর্থাৎ সেগুলো হয় উন্নত হবে, নইলে রূপান্তরিত হবে, আর না হলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। শ্রমভিত্তিক কাজের জায়গায় প্রযুক্তিনির্ভর মূলধনের ব্যবহার বাড়ায় এটি শিক্ষাব্যবস্থা এবং সরকারের কর আদায়ের কৌশলেও বড় পরিবর্তন আনবে।
নতুন গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারাতনাম। তাঁর মতে, এআইয়ের কারণে এখন প্রথম বা এন্ট্রি-লেভেলের চাকরিতে চাহিদা কমে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই যদি সঠিক নিয়মে ব্যবহার করা না হয়, তবে তা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে; তাই এআইকে এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে যেন তা মানুষের জন্য নতুন ও উন্নত কাজের সুযোগ তৈরি করে।
আইএমএফ ও সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্টের উদ্বেগের পাশাপাশি খানিকটা ভিন্ন ও আশাব্যঞ্জক মত দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ। এআই রাতারাতি তরুণদের এন্ট্রি-লেভেল চাকরি ধ্বংস করে দেবে—এ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন বলে জানান; তাঁর মতে, বড় বড় এআই মডেলের প্রভাব মূলত উন্নত বিশ্বেই বেশি পড়বে।
অজয় বঙ্গ জানান, বিশ্বব্যাংক মূলত ‘স্মল এআই’ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। এতে বিশাল কম্পিউটিং পাওয়ার বা বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের প্রয়োজন হয় না; বরং স্বল্প খরচে সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশের কৃষক, স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।
প্রযুক্তির এই জোয়ার রোখা সম্ভব নয়। তবে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন দক্ষতায় নিজেদের গড়ে তোলাই এখন মানবসম্পদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
প্রেক্ষাপট
সম্মেলনটি ঘিরে ব্যাংককের জন্য একটি বিশেষ তাৎপর্যও রয়েছে। দ্য স্ট্যান্ডার্ডের ১২ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব পেল থাইল্যান্ডের রাজধানী, আর উদ্বোধনী দিনের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল এআই।
সংখ্যার হিসাব
দ্য স্ট্যান্ডার্ডের একই প্রতিবেদনে জর্জিয়েভার বরাতে বলা হয়েছে, এআই বিশ্বজুড়ে ৪০ শতাংশ চাকরিতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার ২৩ শতাংশ; প্রযুক্তিটি পুরো পদ বিলুপ্ত করার আগে মূলত কাজের ধরন বদলে দেয়। উন্নত অর্থনীতির ৬০ শতাংশ ঝুঁকির কথা ওই প্রতিবেদনে নেই—সূত্রভেদে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
একই প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নত এশীয় অর্থনীতিতে এআইনির্ভর উৎপাদনশীলতা বার্ধক্যজনিত জিডিপির চাপের সর্বোচ্চ ১ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত পুষিয়ে দিতে পারে — দ্য স্ট্যান্ডার্ড ১২ অক্টোবর ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে।
এক নজরে
অজয় বঙ্গ কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পাঁচটি খাতকে চিহ্নিত করেছেন—অবকাঠামো, কৃষি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও উৎপাদনশিল্প; তাঁর মতে এআইয়ের যুগে কর্মসংস্থান নির্ভর করবে অবকাঠামো ও সুশাসনের ওপর — দ্য স্ট্যান্ডার্ড ১২ অক্টোবর ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: দ্য স্ট্যান্ডার্ড, ১২ অক্টোবর ২০২৬