ছবিঃ সংগৃহীত
কাজী সব্যসাচী স্বল্পায়ু জীবনের মধ্যেই আবৃত্তি ও উচ্চারণশিল্পকে পৌঁছে দিয়েছিলেন আধুনিক ও নান্দনিক শিল্পকলার মর্যাদায়। বাংলা আবৃত্তিশিল্পে তিনি নিজের স্বতন্ত্র জায়গা গড়ে নেন বিশেষত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে। কবিতাকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আবৃত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে আজ বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হলে ‘কাজী সব্যসাচী: আধুনিক নজরুল আবৃত্তির প্রাণপুরুষ’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়; বক্তারা সেখানে এ কথাগুলো বলেন।
আবৃত্তিশিল্পী ও আইনজীবী নাসিম আহমেদ সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আলোচক ছিলেন সংগীতশিল্পী, সংগঠক এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্য খিলখিল কাজী এবং আবৃত্তি গবেষক ও বাচিকশিল্পী নিমাই মণ্ডল।
বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা স্বাগত বক্তব্য রাখেন, আর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
নাসিম আহমেদ প্রবন্ধে বলেন, কাজী সব্যসাচী তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে আবৃত্তি ও উচ্চারণশিল্পকে উন্নীত করে গেছেন আধুনিক ও নান্দনিক শিল্পকলার মর্যাদায়। ভরাট, পৌরুষদীপ্ত, মেঘগম্ভীর ও মধুময় ছিল তাঁর কণ্ঠ। আধুনিক আবৃত্তিশিল্পের অনুসরণযোগ্য প্রধান পুরুষ হিসেবে তিনি দীর্ঘকাল স্মরণীয় থাকবেন।
তিনি বলেন, নজরুলের কবিতার পাশাপাশি অন্য কবিদের কবিতাও সব্যসাচী আবৃত্তি করেছেন অসাধারণ দক্ষতায়। ব্যাপক জনপ্রিয়তা তিনি পেয়েছিলেন নজরুলের কবিতার আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে, তবে অন্য কবিদের কবিতার আবৃত্তিতেও ঈর্ষণীয় দক্ষতা ছিল তাঁর। মধ্যবিত্তের ঘর থেকে বের করে আবৃত্তিকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন মাঠে-ময়দানে, সাধারণ মানুষের কাছে।
নাসিম আহমেদ বলেন, উচ্চারণ, আবৃত্তি ও ধ্বনিশিল্পের জগতে নজরুল-আবৃত্তির প্রাণপুরুষ কাজী সব্যসাচী বহুকাল দীপ্যমান থাকবেন আধুনিক আবৃত্তিশিল্পের উদ্গাতা হিসেবে। নজরুল-সাহিত্যের নান্দনিক ধ্বনিমাধুর্যের প্রচারক হিসেবেও তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয় থাকবেন।
খিলখিল কাজী বলেন, বাবা কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তি শুনতে শুনতেই ছোটবেলা থেকে তিনি বড় হয়েছেন। সব্যসাচী কবিতা আবৃত্তি করতেন দাদা কাজী নজরুল ইসলামের সামনে, নজরুল তা শুনতেন নীরবে। বাংলাদেশে আসার পর নজরুল যে সুন্দর বাড়িটিতে থাকতেন, তাতে বড় একটি বাগান ছিল। ফুল তাঁর খুব প্রিয় ছিল।
মা মাঝেমধ্যে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাগানে যেতেন। আবার কখনো কখনো নজরুল একাও বাগানে চলে যেতেন; ফুলগাছের পাশে বসে তিনি কী যেন বলতেন বিড়বিড় করে।
তিনি বলেন, আবৃত্তিকে ভালোবেসে একজন মানুষের পক্ষে কতটা জনপ্রিয় হওয়া সম্ভব, তার দৃষ্টান্ত কাজী সব্যসাচী। মানুষের মন তিনি জয় করেছেন আবৃত্তি দিয়ে, আর এই শিল্পকে নিয়ে গেছেন মানুষের হৃদয়ের কাছে। তিনি দেখিয়ে গেছেন যে, আবৃত্তিকেও পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
খিলখিল কাজী আরও বলেন, তাঁর বাবার আবৃত্তি ছিল খুবই ভালো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই সব্যসাচীর কাছে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর দাদা কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করার জন্য। এ রকম বহু স্মৃতি আছে।
ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা, প্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। তাঁর কবিতার ভাষা তেজোদীপ্ত; একইভাবে এর ছন্দ, ধ্বনি ও শব্দবিন্যাসও আবৃত্তির পক্ষে বিশেষভাবে উপযোগী।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, কাজী সব্যসাচী আবৃত্তি উপস্থাপন করেছেন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নজরুলের কবিতার বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে। নজরুলের কবিতা তিনি আত্মস্থ করেছিলেন শৈশব থেকেই। এর ফলে সব্যসাচীর আবৃত্তির সঙ্গে নজরুলের কবিতার বৈশিষ্ট্যের একটি সৃজনশীল সংযোগ তৈরি হয়।