প্রায় ১৪ মাস রক্তের ক্যান্সারে ভোগার পর চলে গেলেন শিল্পী যোগেন চৌধুরী
ছবিঃ সংগৃহীত
বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী আর নেই। রবিবার সকালের দিকে কলকাতার বেসরকারি রুবি জেনারেল হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৪ মাস ধরে তিনি রক্তের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। কয়েক দফা কেমোথেরাপি নিলেও শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
দুর্গাপূজা চলার মধ্যে গত ১৬ অক্টোবর, ষষ্ঠীর দিন মূত্রনালির গুরুতর সংক্রমণ ও সেপসিসের উপসর্গ নিয়ে তাঁকে ইএম বাইপাসের ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়; চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই তিনি মারা যান।
তাঁর প্রয়াণে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এদিন মেদিনীপুরের রামনগরে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে শোক জানিয়ে বলেন, “উনি (যোগেন চৌধুরী) বড় মাপের শিল্পী ছিলেন। দেশ এবং জাতিকে যে সম্পদ, সৃষ্টি উনি দিয়ে গেছেন এগুলো অক্ষয় ও অমর থাকবে। উনার বিদেহী আত্মার প্রণাম জানাই। অমরত্ব প্রার্থনা করি।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “দিল্লির রাজিনা হিলস'এর রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে শুরু করে বহু সরকারি স্থাপত্যে তিনি তার উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। যেটা কয়েক শতাধিক বছর ধরে থাকবে।”
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “যোগেন চৌধুরী ছিলেন বাংলা ও ভারতের গর্ব। তিনি বিশ্বজুড়ে শিল্পীদের জন্য—এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্যও—এক বিশাল অনুপ্রেরণা ছিলেন। তাঁর পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং বিশ্বজুড়ে থাকা তাঁর সকল অনুরাগীর প্রতি আমি সমবেদনা জানাই।”
২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ (এআইটিসি)-এর পক্ষে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। ২০১২ সালে তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁর চলে যাওয়ায় শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে এমন এক শূন্যতা তৈরি হলো, যা পূরণ হওয়ার নয়।
অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার, তবে যোগেনের মনে শিল্পের বীজ বুনে দিয়েছিলেন তাঁর মা। মায়ের আঁকা আলপনা দেখেই ছোটবেলায় ছবি আঁকার প্রতি গভীর টান জন্মায় তাঁর।
দেশভাগের সময় ১৯৪৮ সালে ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবারসহ কলকাতায় চলে আসেন তাঁরা। ১৯৫১ সাল থেকে দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া হয়ে ওঠে তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা।
১৯৬০ সালে কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে পাস করে হাওড়ার একটি স্কুলে শিল্পশিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৬২ সালে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার পদে যোগ দেন; পরে মাদ্রাজেও টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন।
১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে শিল্পশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান স্বপ্নের শহর প্যারিসে।
দেশে ফিরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটরের দায়িত্ব পালন করেন। শান্তিনিকেতনের কলাভবনেও দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন তিনি।
শিল্পের বাইরে রাজনীতিতেও পা রেখেছিলেন যোগেন চৌধুরী। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি।
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের সঙ্গেও তাঁর যোগ ছিল। ইত্তেফাকের ২৬ মে ২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর ঢাকার বনানীর আর্কেডিয়া আর্টস গ্যালারিতে তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী হয়; তার আগে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ‘জয়নুল সম্মাননা’ পান।
এক নজরে
ভারতের শিল্প সংগ্রহশালা সারমায়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে যোগেন চৌধুরী রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর নিযুক্ত হন এবং ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে চিত্রকলার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
সংগ্রহশালাটির বর্ণনায়, কেবল কালো রেখায় আঁকা, খানিকটা বিকৃত মানবমূর্তির মধ্য দিয়ে সামাজিক যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলা তাঁর কাজের স্বাক্ষর হয়ে উঠেছিল।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: ইত্তেফাক, ২৬ মে ২০২২; সারমায়া