অ্যালগরিদম নয়, জীবনের ইমাম হোক কোরআন-সুন্নাহ: সোশ্যাল মিডিয়ায় সংযমের পাঠ
ছবিঃ সংগৃহীত
ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার), টিকটকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজ যুক্ত পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। এই সময়কে বলা হয় তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, তবে সঙ্গে এনেছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও। অনেকের দিন শুরু হয় মোবাইলের পর্দায় চোখ রেখে, শেষ হয় নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে। এভাবে নিজের অজান্তেই প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন চালানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম।
নামাজে ইমাম সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, মুক্তাদি তাঁকে অনুসরণ করেন। আধুনিক সমাজে অনেক মানুষের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি মূল্যবোধও অনেকাংশে চলছে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমের নির্দেশে—অনেকটা সেভাবেই। একজন মুমিনের জন্য বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার মতো। কারণ ইসলাম মানুষকে পরিস্থিতির দাস হিসেবে নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রিত, সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।’(সুরা : আসর, আয়াত : ১-২)
আজ অসংখ্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটিয়ে দেন, অথচ দিন শেষে টের পান যে উল্লেখ করার মতো কোনো উপকারই মেলেনি। ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব একদিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার পদযুগল নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
অতএব সোশ্যাল মিডিয়ায় খরচ করা প্রতিটি মিনিটও আমাদের আমলনামার অংশ।
যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে চিন্তার স্বাধীনতা
সোশ্যাল মিডিয়ার বড় প্রভাবগুলোর একটি হলো, এটি মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। কোনটা ট্রেন্ডিং, কোনটা জনপ্রিয়, কে কী বলছে—এসব দেখে অনেকে নিজের বিবেক ও বিচারবুদ্ধি ছেড়ে জনমতের অনুসারী হয়ে পড়েন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’(সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৬)
আয়াতটি শেখায়, অন্ধ অনুসরণ নয়, যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এ শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
ইসলাম প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার শিক্ষা দেয়। মুমিন কখনো নিজের ইচ্ছা, আবেগ কিংবা পরিবেশের অন্ধ অনুসারী হন না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজের নফসকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, তার আবাস হবে জান্নাত।’ (সুরা : নাজিআত, আয়াত : ৪০-৪১)
এ যুগে নফসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং, সময়ের অপচয় আর ডিজিটাল আসক্তি। একজন সচেতন মুসলিমকে এসব ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে হবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম লক্ষণ হলো, সে অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭)
সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন অসংখ্য বিষয় আছে, যা দুনিয়া বা আখিরাত—কোনোটির জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই উপকারী জ্ঞান, ইসলামী শিক্ষা, ব্যবসায়িক দক্ষতা, শিক্ষামূলক বিষয় আর সমাজকল্যাণমূলক কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত একজন মুমিনের।
সোশ্যাল মিডিয়াকে মুক্তাদি বানানোর অর্থ প্রযুক্তি বর্জন নয়; বরং প্রযুক্তিকে নিজের লক্ষ্য ও মূল্যবোধের অধীনে রাখা। অর্থাৎ আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার দাস হব না; সময় বেঁধে নিয়ে ব্যবহার করব, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং কমাব, উপকারী ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট অনুসরণ করব, গিবত, অপবাদ, অশ্লীলতা ও ফিতনা থেকে দূরে থাকব, আর প্রযুক্তিকে দ্বীনের খেদমত, জ্ঞান অর্জন ও আত্মউন্নয়নের কাজে লাগাব। প্রযুক্তি যখন আমাদের চালাবে না, বরং আমরাই প্রযুক্তিকে চালাব—তখনই সোশ্যাল মিডিয়া হবে মুক্তাদি, আর নিজেদের জীবনের ইমাম হতে পারব আমরা।
একজন মুমিনের ডিজিটাল নীতিমালা
১. দিনের নির্দিষ্ট সময়েই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা।
২. ফজর ও এশার পর অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে আনা।
৩. কোরআন তিলাওয়াত ও ইসলামী জ্ঞানার্জনের জন্য প্রতিদিন কিছু সময় আলাদা রাখা।
৪. কোনো খবর শেয়ার করার আগে তা যাচাই করে নেওয়া।
৫. গিবত, তর্ক-বিতর্ক ও অশ্লীল কনটেন্ট এড়িয়ে চলা।
৬. বাস্তব জীবনের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৭. প্রতিদিন নিজের স্ক্রিন টাইম পর্যালোচনা করা।
সোশ্যাল মিডিয়া এক শক্তিশালী মাধ্যম। এটি জ্ঞান বাড়াতে পারে, আবার কেড়ে নিতে পারে সময় ও চিন্তার স্বাধীনতাও। তাই মুমিনের দায়িত্ব প্রযুক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিজে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে না যাওয়া। ইসলাম আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা আর সময়ের মূল্য শেখায়।
তাই আসুন, সোশ্যাল মিডিয়াকে জীবনের ইমাম না বানিয়ে তাকে মুক্তাদির আসনে বসাই। আমাদের চিন্তা, সময়, আমল ও জীবন পরিচালনার নেতৃত্ব থাকুক কোরআন, সুন্নাহ ও বিবেকের হাতে। তবেই প্রযুক্তির সুফল ভোগ করে দুনিয়া ও আখিরাত—দুই জায়গাতেই সফলতার পথে এগোনো যাবে। মনে রাখতে হবে, মুমিনের হাতে প্রযুক্তি একটি উপকারী হাতিয়ার; কিন্তু প্রযুক্তির হাতে মুমিন কখনো খেলনা হতে পারে না।
প্রেক্ষাপট
দেশে এ প্রশ্ন কতজনকে ছুঁয়ে যায়, তার একটা আন্দাজ মেলে বিটিআরসির হিসাবে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার থেকে বেড়ে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে—যুগান্তর ১৭ অক্টোবর এ তথ্য জানিয়েছে।
একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৭৩.২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭.৮৯ শতাংশ হয়েছে, আর আগস্টে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক ছিল ১২ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: যুগান্তর, ১৭ অক্টোবর ২০২৬