সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগের অভিযোগ জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেলের
ছবিঃ সংগৃহীত
রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আজ মঙ্গলবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, সরকার জুলাইকে ধারণ না করায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না।
জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে না—বিএনপির এমন অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীই জুলাইকে ধারণ করে। সরকার জুলাইকে ধারণ না করায় তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না।’
তাঁর অভিযোগ, ‘সরকার জুলাইকে ধারণ না করায় তারা সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সাংবিধানিক পদ, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও যুবদলের লোকদের বসাচ্ছে।’
সরকারি কর্মকমিশন নিয়েও অভিযোগ তোলেন জামায়াতের এই নেতা। সরকার জুলাই চেতনার বাইরে এসে সম্প্রতি কমিশনে হাত দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে তারা চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে পিএসসির চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্যদের পদত্যাগের কথা বলছেন। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা এই দলীয়করণের বিরুদ্ধে চব্বিশের আন্দোলনে নেমে এসেছিল।’
নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিএনপি তাদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অনড় থাকতে গিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা ফ্যাসিবাদী। তারা নিজেদের মতো বিশেষ কমিটি করে সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধনের পথে যাচ্ছে। তারা ভিন্নমত গ্রহণ করতে পারেনি, স্যাক্রিফাইস করেনি।’
জামায়াত নিজে পাঁচটি নোট অব ডিসেন্ট দিলেও সেগুলোর ওপর অনড় থাকেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্রকাঠামোকে রাখতে তাদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অটল থাকছে। সংবিধান সংস্কার না করে যেভাবে রাখা হচ্ছে, তাতে যে প্রধানমন্ত্রীই আসবেন, তিনিই ফ্যাসিবাদী হবেন।’
ওসমানী উদ্যানের অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার যোগ না দেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে তাঁর নাম উল্লেখ না করা অসম্মানজনক। অথচ প্রতিমন্ত্রীদের নাম কার্ডে উল্লেখ করা হয়েছে। রুলস অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী, তিনি একজন পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রে যথাযথ সম্মান না দেওয়ার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে যাননি।’
বিরোধী দল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে সরকার সেটিকে জুলাই বিরোধী আখ্যা দিয়ে নিজেদের ‘দলীয়করণ ও ব্যর্থতা’ আড়াল করতে সব দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সহযোগিতা কেন লাগবে—এই প্রশ্ন তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ ভোট দিয়ে সংবিধান সংস্কারের রায় দিয়েছে। তারা সংস্কার না করে জনগণকে বাইপাস করে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকার অসত্য তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।’ তিনি এর তীব্র নিন্দা জানান।
ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিজম শিখেছে আওয়ামী লীগকে দেখে। কিন্তু রিজভী সাহেব সাত মাসেই তা ভুলে গেছেন। ফ্যাসিস্ট চিনতে হলে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে। চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, সরকারি পদে দলীয় লোক বসানোই ফ্যাসিবাদের পথ। জনগণের রায় উপেক্ষা করা ফ্যাসিবাদের পথ। গণভোটের রায় না মানা ফ্যাসিবাদের পথ।’
অতীতের জোট প্রসঙ্গে জামায়াতের এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো জোট করিনি। যেমন চারদলীয় ও বিশ দলীয় জোট করা হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। আমরা জামায়াতের প্রস্তুত করা কেয়ারটেকার সরকারের ফর্মুলা বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় পার্টি, বাম দলসহ অনেক দলের সঙ্গে আন্দোলন করেছি।’ তিনি যোগ করেন, ‘বিএনপি গণবিরোধী অবস্থানের কারণে’ ৯৬ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বিএনপির কারণেই আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিল। সে সময় স্বচ্ছ নির্বাচনের দাবিতে জনগণ আন্দোলন করেছিল। মাগুরা মার্কা নির্বাচন করেছে বিএনপি। ক্ষমতায় গিয়ে ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রশিবিরকে উৎখাত করেছে। আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাঁটিনি। জনগণের দাবি আদায় করতে আমরা একত্রে আন্দোলন করেছি।’
সরকারের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে বিরোধী দলের এমপিদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘অনির্বাচিত নারী এমপিদের নির্বাচিত এমপিদের ওপর দারোগাগিরি করতে বসানো হয়েছে। এটি ফ্যাসিবাদের পথ। আমরা অসংলগ্ন আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, আবদুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আব্দুর রব ও মতিউর রহমান আকন্দসহ কেন্দ্রীয় অনেক নেতা।
প্রেক্ষাপট
গণভোটটি হয়েছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত ওই ভোটে ১২ কোটি ৭৭ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ভোট দেন প্রায় ৭ কোটি ৭৭ লাখ জন — দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ রাষ্ট্রপতি জারি করেছিলেন ১৩ নভেম্বর ২০২৫; বাস্তবায়নের ধাপ তিনটি—আইনি আদেশ, গণভোট ও এরপর সংস্কার — বিবিসি বাংলার ভাষ্য অনুযায়ী এ তথ্য জানিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
নোট অব ডিসেন্টের প্রসঙ্গটিও নতুন নয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবিধানসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রস্তাবে বিএনপিসহ কয়েকটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল এবং বিশ্লেষকদের ধারণা, ওই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হবে না।
সংখ্যার হিসাব
বিবিসি বাংলার হিসাবে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল প্রায় ৪ কোটি ৮১ লাখ এবং ‘না’ ভোট প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ; প্রতিবেদনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার বলা হয়েছে ৬০ শতাংশের বেশি — দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে। অন্যদিকে বার্তাবাজার ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার ৬৮ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং ভোটার উপস্থিতি ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ বলা হয়েছে। সূত্রভেদে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার ৪৭টি সংবিধানসংক্রান্ত — দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে এ তথ্য রয়েছে।
এক নজরে
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো পাস করতে হবে — দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার সীমা, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ পৃথক করা এবং দ্বিকক্ষ সংসদ গঠন।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (বিবিসি বাংলা), ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; বার্তাবাজার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, আজকের পত্রিকা