
ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের তিন সপ্তাহ না যেতেই ১১ দিনের দক্ষিণ আমেরিকা সফরে পোপ লিও
ছবিঃ সংগৃহীত
ফুসফুসের ক্যানসারের সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচারের ধকল কাটিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ চতুর্দশ লিও। দেশ তিনটি হলো উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা আর পেরু, যে পেরু তাঁর নিজের দেশ হিসেবে পরিচিত।
কয়েক দশকের মধ্যে এটিকে অন্যতম উচ্চাভিলাষী বিদেশ সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর দিয়েছে।
৭১ বছর বয়সী পোপের ক্যানসারের টিউমার অস্ত্রোপচার করে অপসারণ করা হয়েছে তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর আর কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। ১১ দিনের দক্ষিণ আমেরিকা সফরের জন্যও তাঁকে শারীরিকভাবে উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
আগামী ৬ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত এ সফর নিয়ে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে পোপ লিও বলেন, ‘আমার জীবনের অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত যে মহাদেশে কেটেছে, সেখানে আবার ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’
সফরে তাঁকে ১২ বার উড়োজাহাজে আর দুবার হেলিকপ্টারে চড়তে হবে, আন্দিজ পর্বতমালার উঁচুতে বিশেষ প্রার্থনাতেও অংশ নিতে হবে।
পোপকে এক নজর দেখতে লাখ লাখ ক্যাথলিক অনুসারীর সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ধর্মীয় ও যাজকীয় নানা কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি, যাঁদের মধ্যে আছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই।
ভ্যাটিকান জানিয়েছে, পোপ এখনো অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন। তবু ৫০টিরও বেশি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত স্থানে প্রার্থনা ও ধর্মীয় সমাবেশ, আর আমাজন অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাজকদের হাতে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, প্রবীণ, দরিদ্র ও প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ।
ওয়াশিংটনের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস্টোফার হোয়াইট পোপ লিওকে নিয়ে বই লিখেছেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এটি হবে পোপ হিসেবে লিওর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সফর।’ তাঁর আরও মন্তব্য, ‘অস্ত্রোপচার না হলেও এই সফরটি বেশ ব্যস্ত ও চ্যালেঞ্জিং হতো। এখন তার শারীরিক অবস্থার কারণে সফরটি আরও বেশি পর্যবেক্ষণের মুখে পড়বে।’
বিশ্বের প্রায় ১৪০ কোটি ক্যাথলিকের ধর্মীয় নেতা হিসেবে পোপ সফর শুরু করবেন উরুগুয়ে দিয়ে, যা লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানাবেন দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ইয়ামান্দু ওরসি।
উরুগুয়ের উদারনৈতিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে ক্যাথলিক চার্চের বেশ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য আছে—সমলিঙ্গের বিয়ে, গর্ভপাত ও স্বেচ্ছামৃত্যু। গত বছর দেশটিতে স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধতা পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পোপ লিও জীবনের সুরক্ষার পক্ষে বক্তব্য দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর তাঁর গন্তব্য আর্জেন্টিনা, পূর্বসূরি পোপ ফ্রান্সিসের জন্মভূমি। পোপের দায়িত্বে থাকার সময় ফ্রান্সিস নিজ দেশে সফর না করায় অনেক আর্জেন্টাইনের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল। কর্মকর্তাদের ধারণা, পোপ লিওকে স্বাগত জানাতে প্রায় ৭০ লাখ তীর্থযাত্রী জড়ো হবেন।
বুয়েনস এইরেসে পোপের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ডানপন্থী উদারনৈতিক মতাদর্শের এই নেতার সঙ্গে সাবেক পোপ ফ্রান্সিসের সম্পর্ক ছিল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। পোপ লিওর সঙ্গে মিলেইয়ের যোগাযোগ তুলনামূলক কম উত্তপ্ত হলেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপগুলোর কঠোর সমালোচনা করে আসছেন দেশটির ক্যাথলিক চার্চের নেতারা। তাঁদের মতে, এসব পদক্ষেপের বড় মানবিক মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে; বিশেষ করে সমাজের দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
সফরের শেষ পর্বে পোপ লিও যাবেন পেরুতে, যা তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ও নাগরিকত্বের দেশ। সেখানে তাঁর ফেরা আবেগঘন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পোপের জীবনীকার ও যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যাটিকানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলিস অ্যান অ্যালেন এএফপিকে বলেন, ‘আমি জানি, তিনি পেরুতে ফিরে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে এই সফর তার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
পোপ চতুর্দশ লিওর আগের নাম রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্ট। প্রায় দুই দশক পেরুতে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি; এর মধ্যে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন উপকূলীয় শহর চিকলায়োর বিশপ বা যাজক। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বিশ্বের প্রথম পোপ ও পেরুর নাগরিকত্বধারী লিও দেশটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে একটি মরুভূমির সমতলে প্রার্থনা পরিচালনা করবেন। এরপর তিনি যাবেন সাবেক ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী কুসকো এবং আমাজন অরণ্যের শহর পুকালপায়।
রাজধানী লিমায় পেরুর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট কেইকো ফুজিমোরির সঙ্গে বৈঠক করবেন পোপ। কেইকো দেশটির প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির মেয়ে। দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধে কারাবন্দি হয়েছিলেন তাঁর বাবা; কেইকো এখনো বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে গুরুত্ব দেন।
পেরুর নানা সংকট নিয়েও কথা বলতে পারেন পোপ। এর মধ্যে আছে চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ড ও ব্যাপক চাঁদাবাজিকে ঘিরে বাড়তে থাকা অপরাধপ্রবণতা, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কোকেন উৎপাদন ও বাণিজ্য এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব। দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অভিবাসীদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার বিষয়েও তিনি বক্তব্য দিতে পারেন।
গত এক দশকে কেইকো ফুজিমোরি পেরুর নবম রাষ্ট্রপ্রধান। দেশটিতে এখন প্রায় ১৬ লাখ ভেনেজুয়েলার নাগরিক বাস করছেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ৪০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত কুসকো শহরে পোপের সফর হবে সংক্ষিপ্ত, তিন ঘণ্টারও কম। তবে স্বাস্থ্যের কারণে এ অংশটি বিশেষভাবে নজরে থাকবে। অস্ত্রোপচারের পর পোপ নিজের ক্যানসারের ঝুঁকিকে যথাযথভাবে বিবেচনা করছেন, নাকি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত সেরে উঠেছেন—সে প্রশ্নও রয়েছে।
প্রেক্ষাপট
রয়টার্সের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবরের অস্ত্রোপচারে পোপের ডান ফুসফুসের নিচের লোব অপসারণ করা হয় এবং লাং অ্যাডেনোকার্সিনোমা শনাক্ত হয়, যা ফুসফুসের ক্যানসারের সবচেয়ে প্রচলিত ধরন। আহরাম অনলাইনে প্রকাশিত এএফপির প্রতিবেদন বলছে, চিকিৎসকদের পরামর্শে ২৭ অক্টোবরের নির্ধারিত আসিসি সফর বাতিল করেছিলেন তিনি।
সংখ্যার হিসাব
রয়টার্সের হিসাবে, এই সফরে প্রায় ৩১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১০টি শহরে ৩৬টি ভাষণ দেওয়ার কথা পোপের — পাকিস্তানের দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ২৭ অক্টোবর এ তথ্য প্রকাশ করে।
এক নজরে
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোপ হিসেবে লিওর ১৭ মাসের দায়িত্বকালে এটিই প্রথম বড় স্বাস্থ্যগত ঘটনা।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাসস
প্রেক্ষাপট সূত্র: রয়টার্স (কেএসএল), ২৬ অক্টোবর ২০২৬; আহরাম অনলাইন, ২৬ অক্টোবর ২০২৬; দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ২৭ অক্টোবর ২০২৬; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (ডব্লিউএসবি-টিভি), ২৬ অক্টোবর ২০২৬
