
৫৩ বছরে ঐশ্বরিয়া: পারো থেকে বিনোদিনী, যে চরিত্রগুলো মনে রেখেছে দর্শক
ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্বসুন্দরীর মুকুট, তারপর বলিউডের রুপালি পর্দা, সেখান থেকে বিশ্বমঞ্চ—বর্ণিল ক্যারিয়ারের প্রতিটি অধ্যায়ে নিজস্ব ছাপ রেখেছেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। কখনো প্রেমে মগ্ন পার্বতী, কখনো চঞ্চল শার্লি, আবার কখনো রহস্যঘেরা সুনেহরি হয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
রূপ আর অভিনয়ের পাশাপাশি ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্বের দীপ্তিও তাঁকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি দিয়েছে। আজ জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর জন্মদিন। ১ নভেম্বর ৫৩ বছরে পা রাখলেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন।
ঐশ্বরিয়ার জন্ম ১৯৭৩ সালের ১ নভেম্বর, ভারতের কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালুরুতে। পেশাজীবনের শুরু মডেলিং দিয়ে।
১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুট জেতার পর আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান তিনি। এরপর চলচ্চিত্রে পা রেখে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ১৯৯৭ সালে, মণি রত্নমের তামিল ছবি ‘ইরুভার’ দিয়ে। একই বছর ‘অউর পেয়ার হো গয়া’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় যাত্রা শুরু করেন।
দর্শকের নজর কাড়েন ১৯৯৯ সালের ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ দিয়ে। এরপর অভিনয় করেছেন ‘তাল’, ‘মোহাব্বতে’, ‘দেবদাস’, ‘ধুম ২’, ‘গুরু’ ও ‘যোধা আকবর’-এর মতো ছবিতে। তবে কয়েকটি চরিত্র দর্শকের মনে আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছে।
পারু—‘দেবদাস’
‘দেবদাস’ ছবিতে শাহরুখ খানের বিপরীতে পার্বতী বা পারো চরিত্রে দেখা যায় ঐশ্বরিয়াকে। প্রেম, অপেক্ষা আর বিরহের আবেগে গড়া চরিত্রটিতে তাঁর উপস্থিতি দর্শকের প্রশংসা কুড়ায়।
সঞ্জয় লীলা বানসালির পরিচালনায় নির্মিত ছবিটি ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও দেখানো হয়।
শার্লি—‘জোশ’
‘জোশ’ ছবিতে তিনি শার্লি ডায়াস। গোয়ার প্রাণোচ্ছল এই তরুণীর সাজপোশাক আর সাবলীল উপস্থিতি নব্বইয়ের দশকে দর্শকের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ছবির ‘মেরে খেয়ালোঁ কি মালিকা’ গানটিও পরিচিত হয়ে আছে।
মানসী—‘তাল’
সুভাষ ঘাই পরিচালিত ‘তাল’ মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালে। মানসী চরিত্রে অনিল কাপুর ও অক্ষয় খান্নার বিপরীতে তাঁর অভিনয়, নাচ আর গানের দৃশ্য প্রশংসা পায়। ছবির জনপ্রিয় গানগুলোতেও নজর কাড়েন তিনি।
মেঘা—‘মোহাব্বতে’
২০০০ সালের ‘মোহাব্বতে’তে ঐশ্বরিয়া ছিলেন মেঘা চরিত্রে। শাহরুখ খানের বিপরীতে এ চরিত্রে পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল অল্প সময়ের। তবু গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল মেঘার প্রভাব।
আমিরান—‘উমরাও জান’
২০০৬ সালের ‘উমরাও জান’-এ আমিরান চরিত্রে অভিনয় করেন ঐশ্বরিয়া। এর আগে ১৯৮১ সালের ছবিতে একই চরিত্র করেছিলেন রেখা। নতুন সংস্করণে চরিত্রটিকে নিজের মতো করে ফুটিয়ে তোলেন ঐশ্বরিয়া। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর নাচ আর পোশাকও আলোচনায় আসে।
বিনোদিনী—‘চোখের বালি’
ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ২০০৩ সালের বাংলা ছবি ‘চোখের বালি’তে তিনি বিনোদিনী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির কেন্দ্রে এক শিক্ষিত তরুণ বিধবার জীবন। সেকালের সমাজের নানা বিধিনিষেধের মধ্যে নিজের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা আর আত্মপরিচয়ের জায়গা খুঁজে ফেরে বিনোদিনী। সংযত অভিনয়ে চরিত্রটির বুদ্ধিমত্তা, আবেগের টানাপোড়েন এবং প্রচলিত সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ফুটিয়ে তোলেন ঐশ্বরিয়া। তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম ব্যতিক্রমী ও জটিল চরিত্র ধরা হয় বিনোদিনীকে।
সুনেহরি—‘ধুম ২’
২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ধুম ২’-এ সুনেহরি চরিত্রে একেবারে অন্য রূপে হাজির হন ঐশ্বরিয়া, বিপরীতে ছিলেন হৃত্বিক রোশন। নাচ, স্টাইল আর চতুর চরিত্রের মিশেলে সুনেহরি হয়ে ওঠে তাঁর ক্যারিয়ারের আলোচিত চরিত্রগুলোর একটি।
নীরজা—‘রেইনকোট’
ঋতুপর্ণ ঘোষের আরেক ছবি ‘রেইনকোট’-এ নীরজা চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। অজয় দেবগন অভিনীত মনুর সঙ্গে একসময় প্রেমের সম্পর্ক ছিল নীরজার। বহু বছর পর সাবেক প্রেমিকের সঙ্গে দেখা হলে দুজনের কথায় উঠে আসে অতীতের স্মৃতি, বর্তমান জীবনের সংকট আর নানা অপূর্ণতার গল্প। প্রচলিত বাণিজ্যিক ছবির বাইরে সংযত অভিনয়ে এখানে নিজের ভিন্ন এক দিক তুলে ধরেন ঐশ্বরিয়া।
সাবা—‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’
২০১৬ সালের ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’-এ সাবা তালিয়ার খান চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। সাবা পেশায় আর্ট কিউরেটর। পর্দায় খুব বেশি সময় না থাকলেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকের নজর কেড়েছিল।
বলিউডের বাইরে ইংরেজি ভাষার ছবিতেও কাজ করেছেন ঐশ্বরিয়া। ‘ব্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘দ্য মিস্ট্রেস অব স্পাইসেস’, ‘প্রভোকড’, ‘দ্য লাস্ট লিজিয়ন’ ও ‘দ্য পিংক প্যান্থার ২’ সেগুলোর কয়েকটি। এসব কাজ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রেও তাঁকে পরিচিত করেছে।
কান চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচাতেও তিনি দীর্ঘদিনের চেনা মুখ। প্রথমবার কানে যান ২০০২ সালে, ‘দেবদাস’-এর প্রদর্শনীতে। পরের বছর উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি সদস্য হন। তখন থেকে কানে তাঁর উপস্থিতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনায় এসেছে।
অভিনয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার। ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ ও ‘দেবদাস’-এর জন্য জিতেছেন ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। ২০০৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ২০১২ সালে ফ্রান্স সরকারের কাছ থেকে পান ‘অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ সম্মাননা।
ব্যক্তিজীবনে ২০০৭ সালে অভিনেতা অভিষেক বচ্চনকে বিয়ে করেন ঐশ্বরিয়া। ২০১১ সালের ১৬ নভেম্বর জন্ম নেয় তাঁদের মেয়ে আরাধ্যা বচ্চন। অভিনয় আর পরিবার, দুই দিক সামলেই এগিয়ে চলেছেন তিনি। মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুট, বলিউডের স্মরণীয় চরিত্র, আন্তর্জাতিক ছবি কিংবা কানের লালগালিচা—সব জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। ৫৩তম জন্মদিনে তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সৌন্দর্যের পরিচয় ছাপিয়ে অভিনয়ের নানা রূপেও দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন ঐশ্বরিয়া।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
