
হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন, সৌরবিদ্যুতে যেতে চায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
ছবিঃ সংগৃহীত
স্বাস্থ্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকে আর দশটা সাধারণ সেবার মতো দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তাঁর মতে, এটি অপরিহার্য এবং সরাসরি স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে বড় বড় হাসপাতাল পর্যন্ত সোলার পাওয়ার বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় এই উদ্যোগের রোলআউটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ‘প্রথম চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
আজ বুধবার রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো’-তে ‘সরকারি খাতে ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে দৃষ্টান্ত স্থাপন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আলোচনাটির আয়োজক ছিল সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।
প্যানেলে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) মাহদী আমিন, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো. হাসান জাকির তুহিন, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, ইডকলের হেড অব রিনিউয়েবল এনার্জি এনামুল করিম পাভেল এবং সোল্যারিকের পরিচালক প্রকৌশলী নাজনীন আক্তার।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. মুহিত জানান, দেশজুড়ে তৃণমূল পর্যন্ত সরকারের প্রায় ১৫ হাজার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আছে। এর বাইরে জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে রয়েছে বিশাল অবকাঠামো। হাসপাতালের কাজের বড় অংশ চলে দিনের পিক আওয়ারে, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। তিনি বলেন, ‘অপারেশন থিয়েটার, জরুরি সেবা, নিবিড় পরিচর্যা এবং ভ্যাকসিনের কোল্ড চেইনের সুরক্ষায় আমরা ডিজেল নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতে যেতে বদ্ধপরিকর।’
তাঁর তথ্যমতে, আগামী ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে সব স্বাস্থ্য অবকাঠামোর স্ট্রাকচারাল অডিট এবং জ্বালানি চাহিদার অডিট শেষ করা হবে।
হাসপাতালে বিনিয়োগে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানিয়ে ড. মুহিত বলেন, হাসপাতাল এক দিনের জন্যও বন্ধ রাখা যায় না, তাই এখানে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের পূর্ণ নিশ্চয়তা আছে। তবে বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, অগ্নিকাণ্ড ঠেকাতে সার্টিফাইড যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে হবে এবং প্রত্যন্ত এলাকার প্যানেল চুরি বা নষ্ট হওয়া ঠেকাতে নিরাপত্তার পরিকল্পনা রাখতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রিন এনার্জি সম্প্রসারণের রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘দেশের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ছাদ সৌরবিদ্যুতের উপযোগী এবং কোথায় উদ্বৃত্ত জমি রয়েছে, তা আগামী ছয় মাসের মধ্যে যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা করা হবে।’
মাহদী আমিন জানান, ৫০টির বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০টিরও বেশিতে সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এরই মধ্যে প্রক্রিয়াধীন।
তাঁর মতে, সৌরবিদ্যুতে স্বনির্ভর হতে হলে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে তরুণদের এ খাতের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়তে শিক্ষাব্যবস্থাকেও সেই রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো. হাসান জাকির তুহিন জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ১৭ হাজার সেচ পাম্প সৌর নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। শুষ্ক মৌসুমের বাইরে পাম্প যখন অলস থাকে, তখন এসব প্যানেল থেকে জাতীয় গ্রিডে ৪৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে। এতে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হবে।
সরকারি অবকাঠামোর সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে ইডকলের হেড অব রিনিউয়েবল এনার্জি এনামুল করিম পাভেল জানান, শুধু সরকারি ভবনের ছাদ থেকেই প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সরকার এরই মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করে এ খাতের নীতিমালা সহজ করেছে। ওপেক্স মডেলের আওতায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য শতভাগ পেমেন্ট সিকিউরিটি এবং সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে সোল্যারিকের পরিচালক প্রকৌশলী নাজনীন আক্তার বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সুরক্ষায় ঘন ঘন পরিবর্তন না করে একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে। দিনের বেলায় সোলার পিক উৎপাদনের সময় লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি এড়ানো এবং আন্তর্জাতিক তহবিল আনতে ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত সহজ করার ওপরও জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুল হক। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সৌর খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞসহ নানা পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
সংখ্যার হিসাব
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ৭৪৫ মেগাওয়াট, যার ৮৩ শতাংশই সৌরবিদ্যুৎ; মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতায় নবায়নযোগ্যের অংশ মাত্র ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ — ইউএনবি ১৭ মে এ তথ্য জানিয়েছে।
একই গবেষণায় ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: ইউএনবি, ১৭ মে ২০২৬
