চট্টগ্রামে আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়েছে, মাঠজুড়ে সবুজের ঢেউ
ছবিঃ সংগৃহীত
চট্টগ্রামে কৃষকেরা আমন আবাদের কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছেন; বন্যার আঘাত, জমিতে আটকে থাকা পানি কিংবা বীজতলা নষ্ট হওয়া—সব শঙ্কাই পেছনে পড়ে গেছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সব জেলায় আমনের চারা লাগানো হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ জমিতে। ভাদ্রের হালকা বৃষ্টি পেয়ে রোপা চারা সতেজ হয়ে উঠছে, মাঠজুড়ে এখন সবুজের বিস্তার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রামে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমি। ইতিমধ্যে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬০ হেক্টরে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে, লক্ষ্যমাত্রার হিসাবে যা প্রায় ১০০ শতাংশ। এতে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি চলে এসেছে আমন আবাদ।
রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিল চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় কৃষিক্ষেত্র; সেখানে আমনের চারা রোপণের কাজ শেষ। বিলে আমনের গোছা এখন একটু একটু করে পরিপক্ব হচ্ছে, আর গোটা বিলে সবুজ পাতা দুলছে বাতাসে। সবুজে ঢেকে গেছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, পটিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠও। কয়েক দিন আগে পটিয়ায় গিয়ে দেখা গেছে, ধান রোপণ শেষে কৃষকেরা জমিতে প্রথম দফার সার প্রয়োগ করছেন; কোনো কোনো জায়গায় আগাছা পরিষ্কারের কাজও চলছে।
পটিয়ার হাইলধর এলাকার কৃষক সৈয়দ নূরের ভাষায়, ‘আমি প্রতিবছর ৫ কানি (দুই একর) জমিতে ধান চাষ করি, এবারও তা-ই করেছি। এবার বর্ষাটা খুব ভালো যাচ্ছে, ফুল বর্ষা (কোনো বছর অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি না হলে চাষের সুবিধা বোঝাতে স্থানীয় ভাষায় এই শব্দটি ব্যবহার হয়)। পানির সংকট হচ্ছে না, জমি শুকাতে না শুকাতেই আবার বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো থাকায় আমন রোপা হাইল ধরেছে (পরিপক্ব হয়েছে)। এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।’
বাসসের সঙ্গে আলাপে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো চারা রোপণ, প্রয়োজনীয় সার ও বীজের সরবরাহ এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তার কারণে এবার আমন আবাদ দ্রুত এগিয়েছে। বন্যার পরও চারা নিয়ে কৃষকদের বড় সংকটে পড়তে হয়নি। সরকারিভাবে দ্রুত পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা সময়মতো মাঠে ফিরতে পেরেছেন।’
কক্সবাজারেও আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রার একেবারে কাছাকাছি বলে জানাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য। ওই জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল মোট ১৮ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমি। হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে তার মধ্যে চারা লাগানো হয়েছে ১৮ হাজার ৪২২ হেক্টরে; অর্থাৎ অগ্রগতির হার ৯৯ শতাংশ।
আরও এগিয়ে আছে নোয়াখালী, যেখানে এবার আবাদ লক্ষ্যমাত্রাকেও পেরিয়ে গেছে। ফেনীতে এবার প্রায় ৬৬ হাজার ৮৯৪ হেক্টরে আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল; ইতিমধ্যে প্রায় ৬৬ হাজার ৮৩৭ হেক্টরে আবাদ হয়ে গেছে। লক্ষ্যমাত্রার বিচারে পাঁচ জেলার মধ্যে সবার আগে রয়েছে লক্ষ্মীপুর। জেলাটিতে অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রার ১১৭ শতাংশ, যার অর্থ নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় বেশি জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিকল্পনায় না থাকা অনেক জমিতেও আমন আবাদ হয়েছে; এর পেছনে কাজ করেছে আমনের ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের আগ্রহ।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, আমন মৌসুমে চারার সংকট তৈরি হলে আবাদ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তবে সরকারি উদ্যোগে চারা উৎপাদন ও বিতরণ হওয়ায় এবং কৃষকেরা নিজেরা বীজতলা তৈরি করায় এবার বড় কোনো সংকট দেখা দেয়নি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকেরা নিজস্ব বীজতলার চারা ব্যবহার করেছেন, সেই সঙ্গে সহায়তা পেয়েছেন স্থানীয় নার্সারি ও কৃষি বিভাগেরও। এর ফলে জমি তৈরি হতেই চারা রোপণ করা গেছে।
বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমা বলেন, ‘এবার আমন মৌসুমের শুরুতে বন্যার কারণে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পানি নামার পর কৃষকেরা দ্রুত জমি প্রস্তুত করেছেন। প্রয়োজনীয় সার-বীজ ও চারার সরবরাহ নিশ্চিত থাকায় রোপণে বড় ধরনের ছন্দপতন হয়নি। আবহাওয়াও এখন পর্যন্ত আমনের অনুকূলে থাকায় দ্রুত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়েছে।’
সাতকানিয়ার একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘এবারের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, আমন আবাদ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ কমেনি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে, অনেক জায়গায় চারা ও বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে চারার সংকট হয়নি। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শের পাশাপাশি সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত থাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই আবাদ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে।’