জ্বালানি তেলের দাম কেন লাফিয়ে বাড়ছে, কী করছে জি৭
ছবিঃ সংগৃহীত
চার মাস ধরে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়তে যাচ্ছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি৭; আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে এ কাজ হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের পর, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ার প্রেক্ষাপটে জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটটি। পাশাপাশি প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই সরবরাহ করা হবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল।
বিশ্লেষকেরা অবশ্য বলছেন, এ উদ্যোগের ফলে তেলের, বিশেষত ডিজেলের দাম সাময়িকভাবে কিছুটা কমতে পারে, তবে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ঘাটতির যে মূল সমস্যা, তা এতে কাটবে না। তাই জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করতে হলে আরও বড় পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
কেন এত বাড়ছে তেল ও ডিজেলের দাম?
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দুটি যুদ্ধই মূলত বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে। সেই সঙ্গে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনা ও শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ কমেছে আরও। এতে অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে ডিজেলের বাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জলবায়ু ও পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন বলেন, জরুরি মজুত ছাড়ার বিষয়ে জি৭-এর সিদ্ধান্তে বিশেষত আন্তর্জাতিক ডিজেলের দামের ওপর কিছুটা নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এটি সাময়িক সমাধান হওয়ায় সরবরাহ সংকটের কারণে সৃষ্ট সমস্যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারেরও বেশি বাড়ে, তা-ও এক লাফে। ডিজেলের দাম তার আগেই রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন (৩ দশমিক ৭৯ লিটার) ডিজেলের গড় দাম ছিল ৬ দশমিক ৫০ ডলার; এক মাস আগে এ দাম ছিল ৫ দশমিক ৬১ ডলার।
কী ঘোষণা দিয়েছে জি৭?
জি৭ নেতাদের একটি ভিডিও বৈঠক হয় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সভাপতিত্বে। বৈঠক শেষে জোটটি জানায়, ১০ কোটি ব্যারেল তেল সমন্বিতভাবে বাজারে ছাড়া হবে আইইএ’র মাধ্যমে।
আইইএ’র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল এর আগে জানিয়েছিলেন, জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল ছাড়ার বিষয়ে যে সমঝোতা হয়েছিল, সদস্য দেশগুলো ইতোমধ্যে তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাজারে ছেড়ে দিয়েছে।
নতুন কর্মসূচিতে জি৭-এর তেল মজুত ছাড়ার কাজ শুরু হবে তাৎক্ষণিকভাবে, যা চার মাস ধরে চলবে। এ সময়ের প্রথম ২০ দিনেই বাজারে আসবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল। কোন দেশ কী পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল ছাড়বে, তার বিস্তারিত অবশ্য জানানো হয়নি।
প্রয়োজন পড়লে আরও ডিজেল মজুত ছাড়া নিয়েও আইইএ’র মাধ্যমে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে জি৭।
এর বাইরে জোটভুক্ত দেশগুলো আহ্বান জানিয়েছে, নিজেদের মধ্যে জ্বালানি পণ্য রফতানিতে যেন বিধিনিষেধ দেওয়া না হয়। পাশাপাশি জি৭ দেশগুলোর তেল শোধনাগারের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয়ের উদ্যোগও নেওয়া হবে, যাতে একসঙ্গে একাধিক শোধনাগার বন্ধ হয়ে বাজারে সরবরাহ আরও কমে না যায়।
ডিজেলের সংকট কেন এত তীব্র?
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তেল শিল্প ও বাজার বিভাগের সাবেক প্রধান নিল অ্যাটকিনসন জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমার পেছনে প্রধান কারণ তিনটি।
প্রথমত, ইউরোপে মধ্যপ্রাচ্যের ডিজেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। আগে ইউরোপ বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানি করত সৌদি আরব ও কুয়েত থেকে।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া ডিজেল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ ইউক্রেনের হামলায় দেশটির বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তৃতীয়ত, ডিজেল রফতানি কমিয়েছে চীনও।
এর বিপরীতে ডিজেলের চাহিদা এখনও তুলনামূলক বেশি রয়েছে। কৃষিপণ্যের মৌসুমি সংগ্রহ বা ফসল কাটার সময়ে বিশেষ করে এই চাহিদা আরও বাড়ে।
তথ্য বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজেল উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। বছরে দেশটির ডিজেল উৎপাদন প্রায় ২৪ কোটি ৫ লাখ টন, আর রফতানি দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল।
ডিজেল রফতানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাশিয়া; আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটি দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ ব্যারেল ডিজেল সরবরাহ করে। আর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিজেল উৎপাদক সৌদি আরব, তবে দেশটির উৎপাদনের বড় অংশ ব্যবহৃত হয় অভ্যন্তরীণ বাজারেই।
জি৭-এর উদ্যোগে কি দাম কমবে?
জি৭-এর ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমেছিল, তবে তা সাময়িক। পরে দাম ফের বেড়ে প্রায় ১০২ ডলারে ওঠে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়া হলে বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্যের, বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমতে পারে।
বাজারের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে তা কমাতে জি৭-এর উদ্যোগটি প্রয়োজনীয় ছিল—এমনটা মনে করেন জায়ে ক্যাপিটাল মার্কেটসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাইম আসলামও। অবশ্য তাঁর মতে, বাজারের প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে বিস্তারিত কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ—কোন দেশ কত মজুত ছাড়বে আর রফতানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে কোথায়।
তাঁর ধারণা, জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ সপ্তাহের শেষ ভাগে কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে এর পরের কর্মদিবসে বাজারে আবার বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
নিল অ্যাটকিনসন মনে করেন, জরুরি মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো যায়, কিন্তু বিশ্ববাজারের মৌলিক সমস্যার সমাধান এতে হচ্ছে না। কারণ যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির বৈশ্বিক সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
ডিজেলের দাম বাড়লে কেন সবকিছুর দাম বাড়ে?
বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশ সরাসরি ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল; সে কারণে ডিজেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল পরিবহন খাতেই সীমিত থাকে না।
পেট্রলের ব্যবহার মূলত ব্যক্তিগত গাড়িতে হলেও ডিজেলে চলে ট্রাক, মালবাহী ট্রেন, জাহাজ, ট্রাক্টর, ফসল কাটার যন্ত্র, নির্মাণ ও খনিশিল্পের যন্ত্রপাতি এবং জরুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জেনারেটর—এমন মত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কাউন্সিলের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো ফ্রেডেরিক শ্নাইডারের।
এ কারণে ডিজেলের দাম বাড়লে একই সঙ্গে বেড়ে যায় পরিবহন ও উৎপাদনের ব্যয়। খাদ্য, নির্মাণসামগ্রী ও ট্রাকে পরিবহন করা প্রায় সব রকম পণ্যের দামে এর প্রভাব পড়ে।
এ ক্ষেত্রে কৃষকদের ওপর চাপ দ্বিগুণ। ডিজেলের দাম যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে সারও। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ দুই পণ্যেরই সরবরাহ ও দামে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ডিজেলের উচ্চ দাম কার্যত বাড়তি করের মতোই কাজ করে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি যেমন বাড়ে, তেমনি কমে পরিবহন ও কৃষিখাতের মুনাফা। তাতে অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধির ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
ট্রাম্পের ওপরও বাড়ছে চাপ
ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। সামনে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন; জ্বালানির বাড়তি দাম ভোটারদের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে উদ্বেগ আছে রিপাবলিকানদের মধ্যেও।
রাশিয়ার ডিজেল ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে গত সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রতি আহ্বান জানান ট্রাম্প।
তারপর বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, জরুরি ডিজেল মজুত বাজারে ছাড়তে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। জরুরি মজুত দ্রুত ব্যবহারের জন্য ইউরোপের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও।
ট্রাম্প এমন হুমকিও দিয়েছিলেন যে ইউরোপ মজুত না ছাড়লে ডিজেল রফতানি নিষিদ্ধ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য শুক্রবার তিনি জানান, ডিজেল রফতানি বন্ধ করবে না যুক্তরাষ্ট্র; তাঁর ভাষ্য, বাস্তবে এমন নিষেধাজ্ঞা কখনোই চূড়ান্ত পরিকল্পনার অংশ ছিল না।
জি৭-এর ঘোষণা আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়তে ইউরোপ সম্মত হয়েছে, আর প্রক্রিয়াটি শুরু হবে তাৎক্ষণিকভাবে।
অন্যদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের রেকর্ড উচ্চ দাম মোকাবিলায় একটি নির্বাহী আদেশ জারির প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
সামনে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, জরুরি মজুত ছাড়ার বিষয়ে জি৭-এর সিদ্ধান্তে স্বল্পমেয়াদে বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। বিশেষত ডিজেলের সরবরাহ বাড়লে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতের তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে।
তবে বাজারের মৌলিক সরবরাহ সংকট থেকেই যাবে, যদি অব্যাহত থাকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা এবং চীনের ডিজেল রফতানি কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো।
অর্থাৎ জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ায় বাজারে স্বস্তি এলেও তা সাময়িক; বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম স্থায়ীভাবে কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকটের সমাধানই। সূত্র: আল-জাজিরা