ছবিঃ সংগৃহীত
স্পেনকে আটকে দিয়ে এক রাতেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা। বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলার পর হঠাৎ পাওয়া সেই খ্যাতির সঙ্গে এখন মানিয়ে নেওয়ার লড়াই চলছে অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষকের। ৪০ বছর বয়সী খেলোয়াড়টির পুরো নাম জোসিমার হোসে এভোরা ডিয়াস।
বিশ্বকাপ শেষে জুলাইয়ে তিনি চিলিতে যান। নতুন ক্লাব ‘কোলো কোলো’-তে এখন মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ অভিষেকের ম্যাচে স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। দলটি জায়গা পায় শেষ ৩২-এ, সেখানে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়ে শেষমেশ হারে। আটলান্টায় স্পেন ম্যাচের আগে ভোজিনহা ছিলেন সাধারণ এক গোলরক্ষক। ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় কেটেছে পর্তুগাল, সাইপ্রাস ও স্লোভাকিয়ার তেমন নামডাকহীন সব ক্লাবে।
টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিটের বিপক্ষে গোল না খেয়ে মাঠ ছাড়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখে পৌঁছে যায়। এখন সেই সংখ্যা ২ কোটি ৭৫ লাখ। ম্যাচ শেষে কেঁদে ফেলেছিলেন ভোজিনহা। নিজের ও দলের বড় অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি ছিল মায়ের ভিসা জোগাড় করতে না পারার কষ্ট। ছেলের এই সাফল্য দেখতে মা সেখানে থাকতে পারেননি।
সান্তিয়াগোর সবচেয়ে সফল ক্লাব কোলো কোলোতে যোগ দেওয়ার পর হাজার হাজার দর্শকের সামনে আতশবাজির আলোয় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। অ্যাডিডাস, পেপসি ও রেড বুলের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড তাঁকে বিজ্ঞাপনের মুখ করেছে। সম্প্রতি লন্ডনের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানেও ছিলেন তিনি; বর্ষসেরা পুরুষ গোলরক্ষকের ভোটে তাঁর অবস্থান ছিল ষষ্ঠ।
কিন্তু মাঠের হিসাব অন্যরকম। গত মৌসুম পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগে কাটানো এই খেলোয়াড়কে বেশ কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত কোলো কোলোর সম্ভাব্য ১৪ ম্যাচের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। ক্লাবটি ১৯৯১ সালে কোপা লিবার্তাদোরেস জিতেছিল; দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে টুর্নামেন্টটি চ্যাম্পিয়নস লিগের সমতুল্য।
এই সপ্তাহান্তে তাঁর নতুন দল চিলির লিগ শিরোপার খুব কাছে, সঙ্গে আগামী বছরের কোপা লিবার্তাদোরেসে জায়গা নিশ্চিত করার পথেও। এই ম্যাচেও তাঁকে সম্ভবত বদলি হিসেবেই দেখা যাবে। সাংবাদিকদের ভোজিনহা বলেছেন, লিবার্তাদোরেসে খেলার লক্ষ্য নিয়েই তিনি এসেছিলেন, তবে এখন পুরো মনোযোগ এই সপ্তাহে। ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এরপরই ঠিক হবে; আপাতত সেটা নিয়ে তিনি ভাবছেন না।
বিশ্বকাপের পর তাঁর জীবন আমূল বদলে গেছে। পাড়ি দিয়েছেন নতুন দেশে। অচেনা এক মানুষ থেকে রাতারাতি এমন তারকা হয়েছেন, যাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে আর কিছু নেই। পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগে তিনি আবর্জনা সংগ্রহের কাজ করতেন।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য অবজারভার’-কে ভোজিনহা বলেছেন, তিনি নিজের শান্তি আর স্বস্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে আর কিছু নেই, আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। বাইরে গেলে বা রেস্তোরাঁয় বসলে কেউ না কেউ ছবি তুলতে চায় কিংবা অটোগ্রাফ চায়। তাঁর মতে, সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো, কেউ কেউ তাঁকে ভিডিও করতে শুরু করে।
কোলো কোলোতে আসার প্রথম কয়েক সপ্তাহ সান্তিয়াগোর অভিজাত এলাকা ভিটাকুরার একটি বেকারি বা ক্যাফেতে নিয়মিত যেতেন ভোজিনহা। ‘মেতিসাজ’ নামের সেই ক্যাফের ব্যবস্থাপক গুস্তাভো কাসিন এএফপিকে বলেন, সেখানে যাওয়াটা তাঁর জন্য ভালোই ছিল বলে মনে হয়; সবাই উষ্ণভাবে তাঁকে গ্রহণ করত, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও পেতেন।
ফুটবল নিয়ে কাসিন আর ভোজিনহার কখনো আলাপ হয়নি। সকালের নাশতার ‘ক্রোয়াসাঁ’ (এক ধরনের পেস্ট্রি)-র অপেক্ষায় থাকার সময় এই ফুটবলার আবেগ নিয়ে নিজের দেশের গল্প করতেন। একসময় ফুটবলের পাশাপাশি বিচ ভলিবল শেখানোর কাজও করেছেন, যা এখন শুধুই দূরের স্মৃতি। দ্য অবজারভারকে তিনি বলেন, সত্যি বলতে আজকের জীবন আর আগের জীবনের মধ্যে একটি বেছে নিতে বললে তিনি আগের জীবনটাই নিতেন।
২০২৭ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকবেন কি না, নিশ্চিত নয়। কোলো কোলোর সঙ্গে তাঁর চুক্তি ছয় মাসের; পর্যাপ্ত সময় মাঠে খেলার সুযোগ পেলে তবেই সেটি আরও এক বছর বাড়ানো যাবে। তাঁর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিলির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ক্লাউদিও ব্রাভো।
চিলির সাবেক এই অধিনায়কের মতে, যেসব পরিস্থিতিতে পারস্পরিক বোঝাপড়া বা সমন্বয় দরকার ছিল, সেখানে ভোজিনহা বেশ কয়েকটি ভুল করেছেন। আর সেই সমন্বয় না থাকলে ভালো কিছু করা কখনোই সম্ভব নয়। চুক্তির মেয়াদ ফুরানোর আগে ভোজিনহার হাতে আর মাত্র কয়েকটি ম্যাচ; সম্ভবত এর মধ্য দিয়েই চিলিতে তাঁর এই অধ্যায় শেষ হবে।
প্রেক্ষাপট
বিইন স্পোর্টসের ৫ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য সেই ম্যাচে সাতটি সেভ করে বিশ্বকাপ অভিষেকে ক্লিন শিট রাখা সবচেয়ে বয়স্ক গোলরক্ষক হন ভোজিনহা। শেষ ৩২-এ আর্জেন্টিনার কাছে কেপ ভার্দে হেরেছিল অতিরিক্ত সময়ে, ৩-২ ব্যবধানে।
সংখ্যার হিসাব
রয়টার্সের ৫ আগস্টের খবর অনুযায়ী, কোলো কোলো চিলির শীর্ষ লিগ রেকর্ড ৩৪ বার জিতেছে।
চুক্তির মেয়াদ নিয়ে সূত্রভেদে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে — জিও সুপার ৪ আগস্ট ছয় মাসের চুক্তির কথা জানালেও ইউএনবি ১৮ মাসের চুক্তির খবর দিয়েছিল।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রেক্ষাপট সূত্র: বিইন স্পোর্টস, ৫ আগস্ট ২০২৬; রয়টার্স (এনএসটি), ৫ আগস্ট ২০২৬; জিও সুপার, ৪ আগস্ট ২০২৬; ইউএনবি, জুলাই ২০২৬

