এক সপ্তাহে ২৭ পরিবারের ঘর নদীতে, ভাঙনের মুখে কাঁচা আমন কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন তিস্তাপাড়ের কৃষক
ছবিঃ সংগৃহীত
নদ-নদীর পানি থিতিয়ে এসেছে, বর্ষা পেরিয়ে এখন হেমন্ত। আগাম নবান্নের আমেজে কৃষকের মুখে হাসিও ফুটেছে। কিন্তু এর মধ্যেই বিভিন্ন নদীর অববাহিকায় শুরু হয়েছে তীব্র ভাঙন। একের পর এক এলাকা নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে; ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো চলে যাচ্ছে নদীগর্ভে।
তিস্তার পাড়েও দেখা যাচ্ছে একই দৃশ্য। পানি উন্নয়ন বোর্ড লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল রায় জানিয়েছেন, টানা ভাঙনে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি এবং রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জয়রামওঝা চল্লিশসাল এলাকায় এক সপ্তাহের মধ্যে ২৭ পরিবারের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ফসলি জমিও ভাঙছে। নিরুপায় হয়ে কৃষকেরা তাঁদের স্বপ্নের আমন ধান কেটে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন।
বাসসকে তিনি বলেন, পানি যত কমছে, ভাঙন তত তীব্র হচ্ছে। এখন কোনো বরাদ্দ না থাকায় তাঁরা ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবল স্রোতের তোড়ে নদীর পাড় ধসে পড়ছে। ভাঙনের মুখে থাকা পরিবারগুলোর কেউ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার শেষ চেষ্টা হিসেবে ঘর বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। কোথাও বসতভিটা ইতিমধ্যে নদীতে চলে গেছে, কোথাও তা ভাঙনের কিনারে। ফসলি জমি প্রতিদিনই নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের ভাষ্য, কিছুদিন আগে তিস্তার পানি বাড়লে স্রোতের তীব্রতাও বেড়ে যায়। পরে পানি নামতে শুরু করলে স্রোত মোড় নিয়ে জয়রামওঝা চল্লিশসাল চরের দিকে ছুটতে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত এক সপ্তাহে ভাঙনে ওই চরের ২৭টি পরিবার ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন বাবর আলী, গোলাপী বানু, গোলজার হোসেন, নুর ইসলাম, মতিয়ার রহমান, আহাদ আলী, জহুরা বেগম, আসাদুল ইসলাম, আব্দুল হক, মইনুল ইসলাম, শাহ আলম, নজু মিয়া, মোন্নাফ আলী, আবুল হোসেন, শফিকুল ইসলাম, দুলু মিয়া, নুরুল ইসলাম, নাজমুল হক, ঝন্টু, বেলাল, ওমরসহ অন্যরা। ভাঙনের আতঙ্কে অনেকেই ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। এলাকাটিতে এরই মধ্যে উঠতি আমন ধানসহ অন্তত ৫০ একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন না থামায় চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের।
ক্ষতিগ্রস্তদের একজন জাহেদুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর ধরে তাঁরা জয়রামওঝা চল্লিশসাল চরে থেকে চাষাবাদ করে সংসার চালাচ্ছেন। তিস্তার স্রোত হঠাৎ চরের দিকে ঘুরে গেলে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়।
লক্ষ্মীটারী ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বাসসকে জানান, চল্লিশসাল এলাকায় কয়েক দিন ধরে ভাঙন চলছে। বেশ কয়েকটি পরিবারের বসতবাড়ি ও আবাদি জমি ইতিমধ্যে নদীতে হারিয়ে গেছে।
উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তাঁরা ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে দেখলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার বাসসকে বলেন, তিস্তার ভাঙনে বেশ কিছু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হকের ভাষ্য, ‘বন্যার পর হঠাৎ করে ওই এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি দেখে ভাঙন রোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
লালমনিরহাট জেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইখুল আরেফিন বাসসকে জানান, তিস্তার বাম ও ডান—দুই তীরেই ভাঙন তীব্র হয়ে ওঠায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে আমন ধান কেটে গরুকে খাওয়াচ্ছেন। এ পর্যন্ত সাড়ে ১৭ বিঘা জমির আমন ধান কাঁচা অবস্থায় কেটে ফেলেছেন কৃষকেরা।
সংখ্যার হিসাব
এ মৌসুমে তিস্তা অববাহিকায় ভাঙন নতুন নয়। ঢাকা ট্রিবিউনের ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী (ইউএনবি পরিবেশিত), পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিবের হিসাবে তখন রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে ১১৩টি স্থানে ভাঙন চলছিল এবং সাত দিনে অন্তত ৩৮৬টি বাড়ি নদীতে চলে গিয়েছিল।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুরের পীরগাছা, কাউনিয়া ও গঙ্গাচড়ায় সাত দিনে ৫৩টি বাড়ি বিলীন হয়েছিল; ভাঙন রোধে বরাদ্দ অপর্যাপ্ত বলেও জানিয়েছিলেন পাউবোর কর্মকর্তারা।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন (ইউএনবি), ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬