কিয়ামতে সুপারিশ, কবরে সুরক্ষা: কেন নিয়মিত পড়বেন সুরা মুলক
ছবিঃ সংগৃহীত
কোরআনের প্রতিটি সুরাই মুমিনের জন্য পথনির্দেশ আর কল্যাণের উৎস। তবে সুরা মুলকের আলাদা মর্যাদার কথা একাধিক হাদিসে এসেছে। বর্ণনা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন এই সুরা তার নিয়মিত পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে; কবরের আজাব থেকে রক্ষার ফজিলতও এর সঙ্গে যুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রাতে এ সুরা পড়ার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন।
সুরাটির আয়াতগুলো আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, সৃষ্টির নিখুঁত বিন্যাস, জীবন ও মৃত্যুর উদ্দেশ্য এবং পরকালের জবাবদিহির কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই কেবল তিলাওয়াত নয়, অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টাও জরুরি।
সুরাটির পরিচয়
সুরা মুলক কোরআনের ৬৭তম সুরা, ২৯তম পারার শুরুতেই এর অবস্থান। আয়াত ৩০টি, রুকু দুটি। ‘মুলক’ অর্থ রাজত্ব বা কর্তৃত্ব; সুরার শুরুতেই আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্ব ও মহিমার ঘোষণা।
এতে আসমান ও গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টির কথা, সৃষ্টিজগতের নিপুণতা আর আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে। জীবন-মৃত্যু সৃষ্টির উদ্দেশ্য তুলে ধরে মানুষকে তার আসল লক্ষ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহভীরু ও তাঁর পথে অবিচলদের জন্য আছে পুরস্কারের সুসংবাদ, আবার অবাধ্যতা ও সত্য থেকে মুখ ফেরানোর পরিণতির কথাও আছে। শেষাংশে আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে মানুষের অসহায়ত্ব আর তাঁর ওপর নির্ভরতার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে, যা কৃতজ্ঞতা, আনুগত্য ও আখেরাতের প্রস্তুতিতে উৎসাহ দেয়।
পাঠকের জন্য সুপারিশ
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরআনে ৩০ আয়াতের একটি সুরা আছে, যা তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করতেই থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করা হয়; সেটি হলো ‘তাবারাকাল্লাযি বিইয়াদিহিল মুলক’, অর্থাৎ সুরা মুলক। (জামে তিরমিজি: ২৮৯১, সুনানে আবু দাউদ: ১৪০০, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৭৮৬ ও মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৭৫)
মুসতাদরাকে হাকেমের ৩৮৩৮ নম্বর হাদিসে আছে, ৩০ আয়াতের এই সুরা এক ব্যক্তির পক্ষে সুপারিশ করে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে পৌঁছে দিয়েছে। এসব বর্ণনা থেকেই সুরাটির মর্যাদা বোঝা যায়; তাই নিয়মিত পড়া এবং এর শিক্ষা জীবনে ধারণ করা মুমিনের কর্তব্য।
কবরের আজাব থেকে সুরক্ষা
কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। সহিহ মুসলিমের ২৮৬৭ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনায় সুরা মুলককে বলা হয়েছে ‘আল-মানিআহ’, অর্থাৎ বাধা দানকারী; এর আমলকারী কবরের আজাব থেকে সুরক্ষা পাবেন বলে সেখানে উল্লেখ আছে। (মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৮৩৯; শুআবুল ইমান: ২২৭৯)
এমন বর্ণনা নিয়মিত তিলাওয়াতে উৎসাহ দেয়। তবে এর সঙ্গে আল্লাহর আনুগত্য, গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা চাওয়াও জরুরি।
কখন ও কীভাবে পড়বেন
হজরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) সুরা সাজদাহ ও সুরা মুলক না পড়ে ঘুমাতে যেতেন না। (জামে তিরমিজি: ৩৪০৪; মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৫৪৫; মুসনাদে আহমাদ: ১৪৬৫৯) তাই ঘুমানোর আগে, কিংবা চাইলে ইশার নামাজের পর এ সুরা পড়ার অভ্যাস করা যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়কে বাধ্যতামূলক না ভেবে নিয়মিত পড়াটাই আসল।
যাঁদের মুখস্থ নেই, তাঁরা কোরআন দেখে পড়তে পারেন; ধীরে ধীরে মুখস্থের চেষ্টা আর বাংলা অনুবাদ পড়ে অর্থ বোঝার অভ্যাসও গড়া যায়। পরিবারের সদস্যদেরও সুরাটি শেখানোর প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ঘরে তিলাওয়াতের পরিবেশ তৈরি করে সবাই মিলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পড়া যেতে পারে। শিশুদের আগে শুদ্ধ উচ্চারণ, পরে আয়াতের সহজ অর্থ শেখানো যায়, এতে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন মজবুত হয়, তেমনি বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা ও জবাবদিহির বোধও জাগে।
সুরাটির মূল বার্তা—মানুষ যেন নিজের শক্তি, সম্পদ বা ক্ষমতাকে চূড়ান্ত না ভাবে; সবকিছুর প্রকৃত মালিক আল্লাহ। তাই পড়ার সময় কোন আয়াতে তাঁর ক্ষমতা, কোথায় মানুষের পরিণতি নিয়ে সতর্কবার্তা আর কোথায় নেয়ামতের কথা—তা বুঝে পড়লে শিক্ষাটা জীবনে কাজে লাগানো সহজ হয়। নিয়মিত তিলাওয়াত, ফজিলতের হাদিস থেকে প্রেরণা নেওয়া এবং সে অনুযায়ী জীবন গড়ার চেষ্টাই মুমিনের জন্য কল্যাণকর।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা