অস্ত্র তৈরিতে অপব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা—আইপিও নথির ১০০ পাতায় নিজের ঝুঁকির লম্বা ফর্দ দিল অ্যানথ্রপিক
ছবিঃ সংগৃহীত
শেয়ারবাজারে নাম লেখাতে চাওয়া কোম্পানিগুলো সাধারণত কয়েক ডজন পাতায় ব্যবসার বড় বাধা ও ঝুঁকির বিবরণ দেয়। চ্যাটবট ক্লদের (Claude) নির্মাতা অ্যানথ্রপিকের (Anthropic) প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর নথিতে সেই তালিকা অনেক বেশি লম্বা। সেখানে আছে তাদের প্রযুক্তি দিয়ে রাসায়নিক অস্ত্র বানানোর আশঙ্কা, ব্যয়বহুল মামলার ঝুঁকি, এমনকি নিজেদের পণ্য একদিন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে যেতে পারে—এমন উদ্বেগও।
নথি পড়লে একটি কোম্পানির ছবি পাওয়া যায়, যারা দ্রুত বাড়ছে, প্রতিযোগিতার চাপও সামলাচ্ছে, আর এমন প্রযুক্তি গড়ছে যা তাদের ভাষায় দুনিয়া বদলে দিতে পারে। তবে সেই বদলের দাম বিপর্যয়ও হতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে অ্যানথ্রপিক লিখেছে, ‘শক্তিশালী এআইকে যদি মানবজাতির সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলো সমাধানে কাজে লাগানো হয় এবং ঝুঁকিগুলো দায়িত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে এর সম্ভাবনা অসাধারণ।’ পাশাপাশি এআই মডেল চালাতে দরকারি যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো জোগাড়েও তাদের কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে। আর ক্লদকে বড় মুনাফার পণ্যে পরিণত করে প্রমাণ করতে হবে, বিশাল বাজারমূল্যের পেছনে সত্যিকারের ব্যবসা আছে।
অস্ত্র, হ্যাকিং ও এজেন্টের ঝুঁকি
কোম্পানিটির আশঙ্কা, অসাধু কেউ তাদের প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র বানাতে পারে। নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, কিংবা সেগুলো ঠিকমতো কাজ না-ও করতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছিল, জৈবিক অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা পেতে পারে এমন কাজে যুক্ত কয়েকটি অ্যাকাউন্ট তারা বন্ধ করেছে।
নথিতে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা তাদের এআই এজেন্ট—অর্থাৎ নিজে থেকে পদক্ষেপ নিতে পারে এমন মডেল—ব্যবহার করে ‘তথ্য চুরি করে বাইরে নিয়ে যাওয়া, অনুমোদনহীন লেনদেন’ কিংবা অন্য সিস্টেমে ক্ষতিকর কোড ঢোকানোর মতো কাজ করাতে পারে। গত বছর তারা দেখেছে, চীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট একটি হ্যাকার দল তাদের কোডিং টুল দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩০টি লক্ষ্যবস্তুতে ঢোকার চেষ্টা করেছিল।
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার একটি হলো, এআই এজেন্ট নিজে এমন কাজ করে বসছে, যা মানুষের উদ্দেশ্য বা নির্দেশের সঙ্গে মেলে না। অ্যানথ্রপিকের এজেন্ট কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন ধরে জটিল, বহু ধাপের কাজ নিজে থেকে শেষ করতে পারে। আবার এরাই কোড বদলাতে পারে, ‘তথ্য মুছে ফেলতে বা পরিবর্তন করতে পারে’, অন্য সিস্টেমে ঢুকে পড়তে পারে, মানুষ হস্তক্ষেপের সুযোগ পাওয়ার আগেই আর্থিক লেনদেনও সেরে ফেলতে পারে। নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
কোম্পানিটি স্বীকার করেছে, নিজেদের প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, বিশেষ করে মডেলগুলো কেন নির্দিষ্টভাবে আচরণ করে, তা সব সময় পুরো বুঝে ওঠা বা ব্যাখ্যা করা তাদের পক্ষে সম্ভব না-ও হতে পারে। তাদের চারটি মডেল তৃতীয় পক্ষের সিস্টেমে হ্যাক করেছে; একটি মডেল অ্যাডমিন অ্যাকসেস পেয়ে সিস্টেমের সেটিংস বদলেছে এবং এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য পড়েছে। এ ধরনের ঘটনা তাদের ‘সুনাম ও ব্র্যান্ড, ব্যবসা, আর্থিক অবস্থা এবং পরিচালনাগত ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে’ বলে নথিতে উল্লেখ আছে।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা
অ্যানথ্রপিক নিজেদের মডেল ও পণ্য বানাতে-উন্নত করতেও এআই ব্যবহার করছে। এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে এই প্রবণতা মিলে এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অনেক দ্রুত এগোবে এবং শেষে লাগাম ছাড়িয়ে যাবে।
নজরদারি করা গেলেও আরেকটি সমস্যা আছে: কোম্পানির ভাষ্যে, কিছু মডেল নিজেদের কাজের চিহ্ন লুকাতে এবং কী করছে তা গোপন রাখতে শুরু করেছে। নথিতে লেখা, ‘আমাদের নিজস্ব মডেলসহ বিভিন্ন মডেল, এআই শিল্পে পর্যবেক্ষণ করা কিছু ঘটনায়, এসব মডেলের মূল্যায়ন, নম্বর নির্ধারণ বা তদারকির জন্য ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলোতে হস্তক্ষেপ, সেগুলোকে প্রভাবিত করা কিংবা সেগুলোকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে মডেলগুলোর কর্মদক্ষতা বা সামঞ্জস্য মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাগুলোও রয়েছে।’ এখানে ‘সামঞ্জস্য’ মানে এআইয়ের আচরণ মানুষের উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ ও নিরাপত্তা-প্রত্যাশার সঙ্গে মিলিয়ে রাখা।
মডেলগুলো মানুষকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে পারে, কখনো নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্যও—এমন আশঙ্কাও আছে নথিতে। কিছু ঘটনায় মডেলের আচরণ ‘ব্ল্যাকমেলের মতো’ মনে হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। তাদের সতর্কবার্তা, এমন ঘটনা একবার ঘটলেই, বাস্তবে কোনো ক্ষতি না হলেও, জনমনে বড় উদ্বেগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি, মামলা আর সুনামহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মামলা, সরকার ও বিমার ঝুঁকি
নথিতে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত আরও ১৫টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল এআই নিরাপত্তা নিয়ে এই শিল্পের আরেকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত ঘোষণা করেছেন—ইঙ্গিতটি চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের (OpenAI) দিকে। অ্যানথ্রপিক আরও লিখেছে, এআই মডেল ব্যবহারের পর মানুষ আত্মক্ষতি করেছে বা অন্যের ওপর সহিংসতায় জড়িয়েছে; এমন ঘটনা ‘জনসাধারণের তীব্র সমালোচনা, মামলা-মোকদ্দমা, ফৌজদারি তদন্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং সুনামহানির’ কারণ হতে পারে। এসব ঝুঁকির বিমা পাওয়াও কঠিন হতে পারে; পুরো বিমা শিল্পই হয়তো ‘এআই-সম্পর্কিত কোনো বিপর্যয়কর ঘটনার’ দায় নিতে পারবে না।
স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিরোধের মতো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসায় বড় ঝুঁকি তৈরি করছে, যার মধ্যে মার্কিন সরকারের পদক্ষেপও আছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে মার্কিন সরকারের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের সম্পর্ক বেশ বিরোধপূর্ণ ছিল। নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুর দিকে পেন্টাগন অ্যানথ্রপিককে ‘সরবরাহব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি’ ঘোষণা করেছিল; তার আগে কোম্পানিটি বলেছিল, তাদের প্রযুক্তি ‘যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যাপক নজরদারি কিংবা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের’ কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। নিরাপত্তার উদ্বেগে বছরের শুরুর দিকে বাণিজ্য বিভাগ তাদের সর্বশেষ মডেলগুলোর ওপর অল্প সময়ের জন্য রপ্তানি বিধিনিষেধও দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময় এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে অ্যানথ্রপিকের সতর্কবার্তার সমালোচনা করেছেন। তবু অবস্থান বদলানোর পরিকল্পনা নেই কোম্পানিটির; এআইয়ের ‘নিরাপদ ও দায়িত্বশীল বিকাশ’ নিশ্চিত করতে পারে বলে তারা যে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও মানদণ্ডকে মনে করে, তার পক্ষে তারা ‘সম্ভবত প্রচার ও তৎপরতা চালিয়ে যাবে’। নথিতে আরও বলা হয়েছে, তারা ইতিমধ্যে ‘বর্ধিত দৃশ্যমানতার’ মুখে পড়েছে; একই অবস্থায় থাকা অন্য কোম্পানিকে বাদ দিয়ে বিশেষ সরকারি সংস্থার বাড়তি নজরদারি বা বেছে বেছে নিশানা হওয়ার ঝুঁকিও তাদের রয়েছে।
কম্পিউটিং আর ডেটা সেন্টারের লড়াই
ঝুঁকির নথির বড় একটি অংশ কম্পিউটিং সক্ষমতা জোগাড়ের প্রতিযোগিতা নিয়ে। বড় এআই ব্যবস্থা চালানোর অবকাঠামোর জন্য তাদের বিশ্বের বৃহত্তম কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। মডেল প্রশিক্ষণ এবং চ্যাটবট-এজেন্ট চালানোর উপাদানের চাহিদা এত বেড়েছে যে সরবরাহ তাল মেলাতে পারছে না। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের (Gartner) পূর্বাভাস, ২০২৭ সালে বিশ্বে এআই অবকাঠামোয় ব্যয় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। শিল্প এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে কতটা সক্ষমতা লাগবে, তা আন্দাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এখান থেকেই এআই বাবল বা কৃত্রিমভাবে ফোলানো বাজার নিয়ে উদ্বেগ—ডেটা সেন্টার ও অবকাঠামোয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালা হচ্ছে, অথচ ভবিষ্যতে সেই অনুপাতে চাহিদা থাকবে কি না, নিশ্চিত নয়। পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেটা সেন্টারের বিরোধিতাও বাড়ছে। ডেটা সেন্টার ওয়াচের (Data Center Watch) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের ৪৫টি প্রকল্প বাধায় পড়েছে বা আটকে গেছে। নিউইয়র্ক ও টেক্সাসে ডেটা সেন্টারে বিধিনিষেধের উদ্যোগকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছে অ্যানথ্রপিক, তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বেশি ডেটা সেন্টার গড়ার চেষ্টা করছে তারা।
কর্মীদের আস্থাও ঝুঁকিতে
নথিতে ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে অনিশ্চয়তার কথাও আছে: ব্যবসার বড় অংশ সীমিত কয়েকটি পণ্য আর অল্প কিছু গ্রাহকের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইপিওতে অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন ২ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে; তা হলে অচিরেই এটি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর কাতারে উঠবে।
শুধু গ্রাহক বা জনসাধারণের কাছে নয়, কর্মীদের কাছেও কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্যতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নথির ভাষায়, ‘আমাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত অঙ্গীকারের ভিত্তিতে যারা কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন, তারা যদি মনে করেন যে আমরা নিজেদের ঘোষিত মূল্যবোধ মেনে চলছি না, তাহলে তাদের মনোবল কমে যেতে পারে, হতাশা ও আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে, নেতৃত্বের ওপর বিশ্বাস হারাতে পারেন কিংবা তাদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেতে পারে।’ কোম্পানিটি আরও লিখেছে, ‘নিরাপত্তা বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রকাশ্যে মতবিরোধ, বর্তমান বা সাবেক কর্মীদের সমালোচনা কিংবা নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের চলে যাওয়া, এসব বিষয় কোম্পানি নিজেদের ঘোষিত মূল্যবোধ থেকে সরে যাচ্ছে বলে যে ধারণা তৈরি হতে পারে, তাকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে।’
প্রেক্ষাপট
ইউরোনিউজ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের খবর অনুযায়ী অ্যানথ্রপিক তাদের এস-১ নথি সীমিতসংখ্যক অংশীদারের সঙ্গে ভাগ করেছে এবং চলতি শরতেই নাসডাকে তালিকাভুক্তির প্রত্যাশা রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নথির প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে রয়েছে ঝুঁকির বিবরণ।
সংখ্যার হিসাব
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মে মাসের তহবিল সংগ্রহে অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন ধরা হয়েছিল ৯৬৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির আয় ছিল প্রায় ৪৬০ কোটি ডলার, আর ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয় ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের মোট আয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এসেছে দুটি গ্রাহক থেকে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: ইউরোনিউজ, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬