জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে কাল নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, ভাষণ ২৪ সেপ্টেম্বর
ছবিঃ সংগৃহীত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে ২৪ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামীকাল তিনি ঢাকা থেকে নিউইয়র্কের পথে রওনা হবেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে কোন কোন বিষয় উঠে আসবে, তা আজ রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। বিষয়গুলো হলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার।
সফরকালে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। নিউইয়র্কের কর্মসূচি সেরে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর দেশের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা।
পররাষ্ট্রসচিব বলেন, কয়েকটি কারণে এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমত, বর্তমান সরকার জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এই প্রথম অংশ নিচ্ছে। এতে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা বিশ্বের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এই প্রথম বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আর সেই অধিবেশনেই সভাপতির দায়িত্বে থাকবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে আমাদের জন্য এটি যেমন একটি বিরল ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তেমনি বিশেষ মর্যাদা ও গৌরবেরও বিষয়।
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব। এসব বৈঠক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক জোরদার করার নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলেও তিনি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির সূচনা হবে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে। ওই দিন সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে যে স্বাগত প্রাতরাশের আয়োজন করছেন, তাতে তিনি অংশ নেবেন। পরে অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যোগ দেবেন অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সন্ধ্যায় তিনি যাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া অভ্যর্থনায়, যা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে আয়োজিত হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ২৩ সেপ্টেম্বর প্রাতরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি বক্তব্য দেবেন বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক একটি সভায়, যার আয়োজক ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন। বিকেলে তিনি যোগ দেবেন ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায়, যেটি জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় ২৪ সেপ্টেম্বর উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী; অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিনি এ বক্তব্য দেবেন। জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে জোরালো অবস্থান, সেখানে তিনি তা তুলে ধরবেন।
আশা করা হচ্ছে, একই দিনের বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ আয়োজিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাইড ইভেন্টেও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ থাকবে। এর একটি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে, যা হবে ২৩ সেপ্টেম্বর; সেখানে রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন।
মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি নিয়ে আরেকটি সাইড ইভেন্ট হবে ২৪ সেপ্টেম্বর, যেখানে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সরকারের নেওয়া উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সেখানে তুলে ধরবেন তিনি; পাশাপাশি গুরুত্ব দেবেন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার ওপর।
সম্মেলনে যোগদানের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক। আশা করা হচ্ছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় এসব বৈঠকের আলোচনায় আসবে।
এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হওয়ার কথা জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে।
ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ আরও কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হবে, যা অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ। এসব আলোচনায় যেসব বিষয়ে জোর দেওয়া হবে, সেগুলো হলো বাংলাদেশের অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সব মিলিয়ে এ সফর বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশের নতুন সরকারের নতুন যাত্রাকে তুলে ধরবে এবং দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রসচিব। তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল, শান্তিপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের বার্তা দিতে চাই।’