বিজয় ও সম্প্রসারণের মানসিকতায় ফেরার ডাক রুবিওর, প্রশ্ন তুললেন লেখক টেড উইডমার
ছবিঃ সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে অতীতের সেই বিজয়, সম্প্রসারণ আর অনুসন্ধানের মনোভাব আবার জাগিয়ে তোলার ডাক দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে তিনি মনে করেন, পশ্চিমের দেশগুলো যদি নিজেদের ঐতিহাসিক মূল্যবোধকে আবার আঁকড়ে ধরতে না পারে, তবে একপর্যায়ে তাদের পতন ঘটতে পারে, বিশ্বে তারা গুরুত্বও হারাতে পারে। লেখক টেড উইডমার অবশ্য রুবিওর এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং এর রাজনৈতিক অর্থ—দুটো নিয়েই সমালোচনা করেছেন।
রুবিও ভাষণটি দেন গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে, ৭ অক্টোবর। পটভূমিতে প্রাচীন অ্যাক্রোপলিস, আর পেছনে সূর্যাস্তের সোনালি আভায় পার্থেনন মন্দির—এমন পরিবেশে দাঁড়িয়ে তিনি পশ্চিমা সভ্যতার অতীত গৌরব আর বর্তমানের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন এবং পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যতের একটি উদ্বেগজনক ছবি আঁকেন।
উইডমারের বিশ্লেষণ বলছে, রুবিওর ভাষণে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের তুলনায় বেশি জায়গা পেয়েছে অনুসন্ধান, বিজয়, সম্প্রসারণ এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তির নেতৃত্বের ধারণা। পশ্চিমা সভ্যতা ক্ষয়ে যাচ্ছে—এমন যে আক্ষেপ তার কথায় প্রকাশ পেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল ধারার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আলোচনার সঙ্গে তার মিল রয়েছে।
বিজয়ের আদর্শ, নাকি গণতন্ত্রের উত্তরাধিকার
সমালোচনায় উইডমার মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রাচীন গ্রিস-রোমের সাহিত্য-দর্শন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা গভীর প্রেরণা পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু অন্য জাতি বা জনগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব কায়েম করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না; তারা চেয়েছিলেন সমান অধিকার ভোগ করা মানুষদের নিয়ে একটি গণতন্ত্র গড়তে।
রোমান দার্শনিক সিসেরোর ভাবনা প্রভাব ফেলেছিল টমাস জেফারসনের ওপর, যিনি মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অন্যতম রচয়িতা। একই প্রজাতন্ত্রের সব নাগরিকের সমান অধিকার ছিল সিসেরোর দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন প্রেরণা খুঁজেছিলেন গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিডের কাজে। টেড উইডমার উল্লেখ করেছেন, লিংকনের চিন্তায় ছাপ ফেলেছিল ইউক্লিডের গাণিতিক যুক্তি আর সমতার ধারণা।
তার মতে, ইতিহাসের এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন সভ্যতা থেকে মার্কিন প্রতিষ্ঠাতারা যে শিক্ষা নিয়েছিলেন, তার লক্ষ্য শুধু শক্তি আর বিজয়ের আদর্শ দাঁড় করানো ছিল না; স্বাধীনতা, যুক্তি আর সমতার ধারণাও তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছিল।
পশ্চিমা সভ্যতার সংজ্ঞা আসলে কী
পশ্চিমা সভ্যতাকে ঠিক কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে—বিশ্লেষণে সে প্রশ্নও তুলেছেন উইডমার। গ্রিস-রোমের প্রাচীন উত্তরাধিকারকেই যদি পশ্চিমা পরিচয়ের ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে রাশিয়ার মতো দেশকে সেই গণ্ডির বাইরে রাখা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। প্রাচীন গ্রিস-রোমের ঐতিহ্যের সঙ্গে রুশ ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও যোগসূত্র রয়েছে।
একই রকম উদাহরণ জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার। প্রাচীন গ্রিস ও রোমান সভ্যতা নিয়ে তারও প্রবল আগ্রহ ছিল, যা ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে প্রকটভাবে ধরা পড়ে। নিজের লেখা বই মাইন কাম্ফ-এ তিনি প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা এবং পারস্য যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া তথাকথিত ‘উচ্চতর সংস্কৃতি’র গুণগান গেয়েছিলেন।
উইডমারের যুক্তি হলো, প্রাচীন সভ্যতাকে শ্রদ্ধা করা কিংবা তার ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি বানানো—এর কোনোটিই কোনো রাজনৈতিক আদর্শকে আপনা-আপনি গণতান্ত্রিক করে তোলে না। আসল বিবেচ্য হলো, ইতিহাসের এই উপাদানগুলোর ব্যাখ্যা কীভাবে দেওয়া হচ্ছে।
ভিত গড়েছে পূর্বের অবদানও
পশ্চিমা সভ্যতা গড়ে ওঠায় অন্য অঞ্চলের ভূমিকার কথাও সামনে এনেছেন উইডমার। তিনি মনে করেন, প্রাচীন গ্রিস ও রোমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ আলাদা বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এর পেছনে পূর্বাঞ্চলের সভ্যতা ও সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল।
লেখার সবচেয়ে পুরোনো পদ্ধতিগুলোর উদ্ভব হয়েছিল প্রাচীন সুমের সভ্যতায়, যার অবস্থান ছিল আজকের ইরাকের ভূখণ্ডে। গণিত ও বিজ্ঞানের অনেক ধারণাও ছড়িয়েছে বিভিন্ন সভ্যতার পারস্পরিক জ্ঞান আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে। প্রাচীন গ্রিক ও পারসিকরা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করলেও তাদের মধ্যকার যোগাযোগ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব ছড়ানোর পথ খুলে দিয়েছিল।
উইডমার মনে করেন, পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসকে শুধু ইউরোপের বিজয় আর সম্প্রসারণের কাহিনি হিসেবে পড়লে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অগ্রগতিতে অন্য অঞ্চলগুলোর অবদান চাপা পড়ে যায়।
ভাষণের বীরগাথা বনাম ইরান যুদ্ধের বাস্তবতা
পারসিক হানাদারদের হাত থেকে অ্যাক্রোপলিস বাঁচাতে লড়াই করা প্রাচীন গ্রিসের ছোট্ট একদল যোদ্ধার সাহসিকতার গল্প ভাষণে শোনান রুবিও। উইডমার অবশ্য মনে করেন, ইরান ঘিরে যে যুদ্ধ চলছে, তার প্রেক্ষাপটে এমন বীরত্বের কাহিনি সামনে আনায় একধরনের স্ববিরোধিতা আছে।
নিবন্ধে তিনি যুদ্ধকালীন মার্কিন সামরিক পরিস্থিতির কথা টেনেছেন। এর মধ্যে আছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের বিমানবাহী রণতরিটির সান ডিয়েগোতে ফিরে যাওয়া, ১২টি বি-১ বোমারু বিমানকে ইংল্যান্ডের একটি ঘাঁটি থেকে প্রত্যাহার এবং সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ। তেলের চড়া দামের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
উইডমারের বিশ্লেষণে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, জুলিয়াস সিজার, শার্লেমেন ও এরনান কোর্তেসের মতো ইতিহাসখ্যাত বিজেতাদের দৃষ্টান্ত টেনে শক্তি ও সম্প্রসারণের আদর্শ হাজির করা হলেও চলমান যুদ্ধের বাস্তবতাই সেই আদর্শের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
‘মহান ব্যক্তি’ আর সাম্রাজ্য পতনের ভাবনা
ইতিহাসে ‘মহান ব্যক্তিদের’ ভূমিকাকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ঝোঁককে রুবিওর ভাষণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন উইডমার। তার ব্যাখ্যায়, রুবিওর কথায় এমন একটি ধারণা প্রকাশ পেয়েছে যে ইতিহাসের গতিপথ ঠিক করেন সেই নেতারা, যারা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে নিজেদের উচ্চাভিলাষ পূরণ করেন এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে পরাস্ত করেন।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, অদম্য উচ্চাভিলাষ, নতুন কিছু খুঁজে বের করা, ঝুঁকি নেওয়া এবং গৌরব অর্জনের বাসনা—এসবের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে রুবিওর ভাষণে। উইডমারের ভাষ্যে, এমন বক্তব্য মাঝে মাঝে ভিডিও গেমের গল্পের মতো শোনায়, যেখানে শক্তিধর চরিত্রগুলোকে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়।
তবে উইডমার এটাও মেনে নিয়েছেন যে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়া, জাতীয় সাফল্য অর্জন ও সাম্রাজ্যকে পতন থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এমন কথাবার্তা ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। গণতন্ত্র কতদিন টিকবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারাও দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন জন অ্যাডামস একসময় লিখেছিলেন, “এখন পর্যন্ত এমন কোনও গণতন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না, যা আত্মহত্যা করেনি।” গণতন্ত্রের পতনের বীজ তার নিজের ভেতরেই জন্ম নিতে পারে—এ কথায় এমন শঙ্কারই প্রতিফলন ঘটেছিল।
অতীত প্রেসিডেন্টদের বক্তব্যের সুর ছিল আলাদা
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট ১৯১০ সালে তার সুপরিচিত ‘ম্যান ইন দ্য অ্যারেনা’ ভাষণে সেই মানুষের গুণগান করেছিলেন, যিনি ব্যর্থ হওয়ার বা ভুল করার ঝুঁকি মাথায় নিয়েও সাহস করে চেষ্টা চালিয়ে যান। সেখানে সাফল্যের পাশাপাশি চেষ্টা, অধ্যবসায় আর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার গুরুত্বও উঠে এসেছিল।
একই ধাঁচে, জন এফ. কেনেডি ১৯৬১ সালে তার অভিষেক ভাষণে বলেছিলেন, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্য দিতে, যেকোনো বোঝা বইতে এবং যেকোনো প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
উইডমারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রুবিওর ভাষণের সঙ্গে এসব বক্তব্যের খানিকটা মিল থাকলেও মৌলিক প্রশ্নটি রয়েই যায়: সামরিক শক্তি, বিজয় আর আধিপত্যের আদর্শ নতুন করে জাগিয়ে তোলার ওপরই কি পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, নাকি গণতন্ত্র, সমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঐতিহ্য আরও মজবুত করার ওপর?
রুবিওর ভাষণ ঘিরে যে বিতর্ক, তার মূলে আছে পশ্চিমা সভ্যতার পরিচয়, ইতিহাসকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে এবং আজকের দুনিয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী—এসব প্রশ্নে নানামুখী দৃষ্টিভঙ্গি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান