সৌদি আকাশ পাহারায় ব্রিটিশ টাইফুন, সঙ্গে যাচ্ছে পরিবহন বিমান ও সামরিক উপদেষ্টা
ছবিঃ সংগৃহীত
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের আকাশপথের হামলা থেকে সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় রয়্যাল এয়ারফোর্সের (আরএএফ) টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়, সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো সুরক্ষায় টাইফুন যুদ্ধবিমান দিয়ে প্রতিরক্ষামূলক আকাশ অভিযান চালাবে ব্রিটিশ বাহিনী।
বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিমানগুলোর ভূমিকা থাকবে কেবল প্রতিরক্ষামূলক; হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণাত্মক হামলা চালানো হবে না।
সৌদি আরবের ভেতরে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য ভারী মালামাল বহনে সক্ষম একটি অ্যাটলাস এ৪০০ এম পরিবহন বিমানও দেবে যুক্তরাজ্য। এর পাশাপাশি সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টারা।
হুতিদের নতুন করে হামলার পর গত সেপ্টেম্বরেও সৌদি আরবকে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটেন; ওই সহায়তায় ছিল আরএএফের একটি আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান। তবে তখন যুদ্ধবিমান পাঠানোর কথা বলা হয়নি।
তারও আগে গত মার্চে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে আঞ্চলিক মিত্রদের সুরক্ষা দিতে মধ্যপ্রাচ্যে চারটি যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কাতারে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা চারটি টাইফুন যুদ্ধবিমানের সঙ্গে নতুন বিমানগুলো যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের হামলার মুখে থাকা আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবে হুতিদের হামলার মাত্রা বেড়েছে। ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষের দাবি, গতকাল সোমবার সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে চালানো হামলায় ৫৮ জন নিহত হয়েছেন।
চলতি মাসেই রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়। সংঘাতের মধ্যে সৌদি তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর ধাহরান সদর দপ্তর এবং দেশটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিস্তৃত একটি তেল পাইপলাইনেও হামলা হয়েছে। গতকাল রাতে রাজধানী রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়, যা দেশটির নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, হুতিদের আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়; তাদের এই আচরণ ইয়েমেনের আগে থেকেই ভয়াবহ মানবিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
হুতিদের এসব তৎপরতা প্রতিহত করা যুক্তরাজ্যের জাতীয় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাস্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সহিংসতা বাড়লে যুক্তরাজ্যেও তার গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে—বাড়তে পারে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যাহত হতে পারে জ্বালানি সরবরাহ এবং বেড়ে যেতে পারে ব্রিটিশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ। একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
প্রেক্ষাপট
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, টাইফুনগুলো প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকায় থাকবে এবং সহায়তার মধ্যে সৌদি আকাশ অভিযানের জন্য আকাশে জ্বালানি সরবরাহের মেয়াদ বাড়ানোও অন্তর্ভুক্ত — আলজাজিরা ২০ অক্টোবর ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে। একই প্রতিবেদনে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং হুতিদের হামলাকে ‘একেবারেই ঘৃণ্য’ বলে বর্ণনা করেন এবং জানান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে সৌদি আকাশসীমা রক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক অভিযান চালাবে টাইফুন।
আরামকোর ধাহরান স্থাপনায় হামলার বিষয়ে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে বার্তা সংস্থা এসপিএ জানায়, হুতিরা সেখানে একটি প্রশাসনিক ভবনকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং এতে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে কর্তৃপক্ষ; ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি — আলজাজিরা ১৩ অক্টোবর ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে।
সংখ্যার হিসাব
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায় আলজাজিরার ১৩ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে: শনিবারের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও তিন শতাধিক আহত হন, এর পরদিন রোববার একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হন একজন ও আহত হন ১১ জন।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন — আলজাজিরা ১৩ অক্টোবর ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে।
এক নজরে
সংঘাতটি দুই দিক থেকেই চলছে। আলজাজিরার ১৩ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানার আল-সাবাহ এলাকায় ইয়েমেন তেল কোম্পানির কেন্দ্রীয় স্টেশন খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পর সেখানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়; জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকির অভিযোগ, হুতিরা ওই স্থাপনা ও তার ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুতে ব্যবহার করছিল।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: আলজাজিরা, ২০ অক্টোবর ২০২৬; আলজাজিরা, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, আজকের পত্রিকা