ছবিঃ সংগৃহীত
স্পেনে বৃহস্পতিবার থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শুরু হয়েছে। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে দেশটিতে ৬৮ জনের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।
স্বজনের খোঁজ পেতে মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করছেন নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা।
চলতি শতাব্দীতে ইউরোপের ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনাগুলোর একটি এটি। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে পরিবহনমন্ত্রী ‘ত্রুটি’ ও ‘ব্যাখ্যাতীত পরিস্থিতির’ কথা জানানোর পর দেশটির রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্পেনের উর্দা থেকে খবরটি দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
বুধবার সকালে স্পেনের মধ্যাঞ্চলীয় কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা এলাকায় সংঘর্ষটি হয়। রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফের একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনের পেছনে আঘাত করে। দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি ছিল বেসরকারি স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান ইরিওর।
এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, মাদ্রিদের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সেভিলের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের দুর্ঘটনাস্থলে রাতে উদ্ধারকাজ চালান জরুরি সেবাকর্মীরা। ধ্বংসস্তূপে আরও হতাহতের খোঁজে ক্রেন দিয়ে সরানো হয় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ধাতব কাঠামোর অংশ।
বান্ধবীকে নিয়ে স্পেনে ছুটি কাটাতে এসেছিলেন পেরুর ৩১ বছর বয়সী নাগরিক জোসিমার মেদিনা। তিনি জানান, রেনফের ট্রেনে ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি, শূন্যে ভাসছি।’
মাথায় আঘাত পেলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন ৪২ বছরের পাবলো মেহিয়া। এএফপিকে তিনি জানান, শেষ মুহূর্তে আসন বদলানোয় তাঁর জীবন রক্ষা পেয়েছে।
পরনে রক্তমাখা ধূসর সোয়েটার, হাতে ছেঁড়াফাটা স্যুটকেস—এ অবস্থায় দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করেন মেহিয়া। তিনি বলেন, ‘খুব জোরে একটা ধাক্কা লেগেছিল। অনেক মানুষ মেঝেতে একে অপরের ওপর পড়ে ছিলেন। আসনগুলো উপড়ে গিয়েছিল, চারদিকে স্যুটকেস ছড়িয়ে ছিল। সবকিছু চরম বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন নতুন করে জন্ম নিয়েছি।’
মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে উর্দার কাছের একটি বিদ্যালয়ে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে আসা পরিবারের সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে আসা লোকজনকে সহায়তা দেন রেড ক্রসের কর্মীরা; কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুলিশ আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের ভিড়ও ছিল সেখানে।
রেড ক্রসের মনোবিজ্ঞানী কারমেন গার্সিয়ার মতে, সামনে ‘দীর্ঘ ও কঠিন সময়’ অপেক্ষা করছে, কারণ প্রত্যেকে নিজের মতো করে পরিস্থিতি সামাল দেবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন মানুষ রয়েছেন, যারা এখনো মানসিক আঘাতের ঘোরে আছেন এবং কী ঘটেছে তা বুঝে উঠতে পারেননি। কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ দুঃখিত, আবার কেউবা উদ্বিগ্ন। তাদের শোক কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’
মৃতদের স্বজনদের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্তের জন্য মাদ্রিদ, তোলেদো, কর্দোবা ও সেভিলে চারটি কার্যালয় খুলেছে সিভিল গার্ড। কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা ও মাদ্রিদে রক্তদানের কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে।
উর্দার গির্জার যাজক হোসে মিগেল ফার্নান্দেজ জরুরি সেবাকর্মীদের সঙ্গে মিলে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মৃত ও নিখোঁজদের স্বজনদের পাশে থাকা, তাদের এটা অনুভব করানো যে আমরা তাদের কাছেই আছি।’ যাজক বলেন, এমন সময়ে কথার কোনো মূল্য নেই, তবে একটি আলিঙ্গন সান্ত্বনা দিতে পারে।
দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা মনে করে ফার্নান্দেজ জানান, সেখানে গিয়ে তিনি ‘ধ্বংস, হতাশা, অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর এক ভয়াবহ দৃশ্য’ দেখেছেন।
পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বুধবার জানান, রেলপথের ৬৯ কিলোমিটার অংশে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছিল, ফলে ওই অংশে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাঁর তথ্যমতে, ইরিওর ট্রেনে ধাক্কা দেওয়ার আগে রেনফের ট্রেনটি ২৫ কিলোমিটার পথ পার হয়। পুয়েন্তে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কাছে ত্রুটিটি শনাক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল। কিন্তু তারা সেটি ঠিক করেনি।’
এর আগে গত জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়ায় দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন মারা যান। সেবার একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে পাশের লাইনে উঠে গেলে অন্য ট্রেনটির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ওই দুর্ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে। তবে রেল ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার অভিযোগে কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে দেশটির বামপন্থী সরকার।
এবারের দুর্ঘটনা ঘটল এমন এক সময়ে, যখন আগামী ২৯ নভেম্বরের আগাম সাধারণ নির্বাচনে প্রতিকূল জনমত জরিপের ফল উল্টে দিয়ে আট বছরের প্রধানমন্ত্রিত্ব ধরে রাখার চেষ্টায় আছেন সমাজতন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
প্রেক্ষাপট
কাতালান সংবাদমাধ্যম আরার ২৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেনের রেল দুর্ঘটনা তদন্ত কমিশন (সিআইএএফ) সেদিন প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে আদামুস দুর্ঘটনার প্রধান সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলেছে, ইরিও ট্রেনটি পৌঁছানোর আগেই লাইনের বাঁ পাশের রেল ভাঙা ছিল।
রেলওয়ে গেজেটের ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতের অনুমতি না মেলায় তখনো ট্রেনের রেকর্ডারের তথ্য বের করা যায়নি; পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে ১৬ ফেব্রুয়ারি জানান, মেরামতের পর মাদ্রিদ–সেভিয়া লাইন আবার চালুর জন্য প্রস্তুত।
সংখ্যার হিসাব
টাইমসলাইভের ১৯ জানুয়ারি ২০২৬-এর তালিকা অনুযায়ী, স্পেনের ভয়াবহতম রেল দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে আছে ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলায় দ্রুতগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ৮০ জনের মৃত্যু এবং ১৯৭২ সালে এল কুয়েরভোতে মুখোমুখি সংঘর্ষে ৮৬ জনের মৃত্যু।
এক নজরে
রেলওয়ে গেজেটের তথ্যমতে, সিআইএএফ স্পেনের জাতীয় রেল দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থা, যা বিচারিক তদন্তের পাশাপাশি আলাদাভাবে কারিগরি তদন্ত চালায়।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: আরা, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬; রেলওয়ে গেজেট, ফেব্রুয়ারি ২০২৬; টাইমসলাইভ, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬