৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই উপজেলায় পাঠানোর লক্ষ্য, প্রাথমিকে ছাপা প্রায় ৯৩ শতাংশ
ছবিঃ সংগৃহীত
দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই পরিমার্জিত নতুন পাঠ্যবই তুলে দিতে চায় সরকার। প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শ্রেণির শতভাগ মানসম্মত ও আকর্ষণীয় বই আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছাতে তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
সংস্থাটির সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ছাপার অগ্রগতি ৫৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপা কিছু প্রেসে শুরু হলেও বেশির ভাগ প্রেসে এখনো শুরু হয়নি।
এনসিটিবির ভাষ্য, যেসব প্রেস প্রাথমিক ও মাধ্যমিক দুই স্তরের বই ছাপার কাজই পেয়েছে, সেগুলোতে প্রাথমিকের বই শেষ করে পুরোদমে মাধ্যমিকের বই ছাপা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ইবতেদায়ি, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই বেশি। পাশাপাশি কিছু ছাপাখানায় অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ের ফর্মা ছাপাও চলছে।
এনসিটিবি জানায়, এবার সারা দেশে মোট ৬২৩টি লটে ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজ পেয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক (ইবতেদায়ি, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি) স্তরে ছাপা হবে মোট ৩০ কোটি ৭৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি বই। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বইও রয়েছে। গত বছরের চেয়ে এক মাস আগেই এবার ছাপার কাজ শুরু হয়েছে।
স্তরভিত্তিক বই মুদ্রণের চিত্র
এনসিটিবির ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই ছাপার কাজ প্রায় শতভাগ, যা চুক্তি অনুযায়ী সন্তোষজনক। প্রাক-প্রাথমিকের মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি (৯৮.২১ শতাংশ)। এ স্তরে প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) হয়েছে ৫০ লাখ ৭০ হাজার ২৪০টি (৮৮.৪৮ শতাংশ) বইয়ের।
প্রাথমিক (১ম-৫ম) স্তরে মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ছাপা শেষ হয়েছে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি (৮৭.৬৭ শতাংশ), আর পিডিআই হয়েছে ৫ কোটি ৯১ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৯টি (৭৭.৭৯ শতাংশ) বইয়ের। অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক মিলিয়ে গড়ে ৯২.৯৪ শতাংশ বই ছাপা হয়ে গেছে।
ইবতেদায়ির বইয়ের দরপত্র মাধ্যমিক স্তরের সঙ্গেই আহ্বান করা হয়েছিল। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ইবতেদায়ি (১ম-৫ম) স্তরের মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি (৬৪.১৫ শতাংশ)। বিপরীতে পিডিআই হয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪২২টি (৫১.১১ শতাংশ) বইয়ের।
মাধ্যমিক (ষষ্ঠ-দশম) স্তরে মোট ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি (৫১.১৮ শতাংশ), পিডিআই হয়েছে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫টি (৩৭.০৫ শতাংশ) বইয়ের। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক মিলিয়ে গড়ে ৫৭.৬৬ শতাংশ বই ছাপা শেষ হয়েছে; বইয়ের মান ও ছাপার কাজ এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদারক করছে এনসিটিবি।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাসসকে বলেন, ‘প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। ইবতেদায়ি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির কাজও অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। তবে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির কাজের গতি কিছুটা কম থাকায় মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এ স্তরের কয়েকটি লটে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করায় কিছুটা ধীরগতি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাজের গতি কম থাকায় ৩২টি প্রেসকে কারণ দর্শানো হয়েছে। প্রয়োজনে পিছিয়ে থাকা প্রেসগুলোর কাজ বাতিল করে অন্য প্রেসগুলোকে দায়িত্ব দিয়ে কাজ সমন্বয় করা হবে। বইয়ের মান ও লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একাধিক টিম মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে।’
সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত বই পৌঁছে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এনসিটিবি জানিয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিকের সব এবং মাধ্যমিক স্তরের ৫০ শতাংশ বই এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় পৌঁছানোর কাজ চলছে। সরকারের লক্ষ্য—আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিটি উপজেলায় শতভাগ মানসম্মত বই সরবরাহ নিশ্চিত করা।
নিম্নমানের ফর্মা-বই বাতিল, মান রক্ষায় নজরদারি
ছাপার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আর বইয়ের মান ঠিক রাখতে এবার কঠোর অবস্থানে শিক্ষা প্রশাসন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসে ছাপা বইয়ের গুণগত মান যাচাইয়ে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে মোট ৫৩টি মনিটরিং টিম মাঠে কাজ করছে। মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রেসের নিম্নমানের ফর্মা ও বই বাতিল করা হয়েছে।
এনসিটিবির মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রিন্টিং প্রেসে মানদণ্ড অনুযায়ী নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ ফর্মা, বই এবং কভার বিনাশ (ডিস্ট্রয়) করা হয়েছে। মোট ৩৬টি প্রেসের ৯ লাখ ফর্মা ও ১২ হাজার নিম্নমানের ছাপা বই বাতিল হয়েছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বাসসকে বলেন, ‘এবার বইয়ের মানের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। গুণগত মান বজায় না থাকায় আমরা সাড়ে ৯ লাখ নিম্নমানের ফর্মা ও ১২ হাজারের মতো বই বাতিল করেছি। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত ও নিখুঁত বই উপজেলায় পৌঁছাতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
মনিটরিং প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের (অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণি) বই ছাপায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি কম। চুক্তি অনুযায়ী ৩ নভেম্বরের মধ্যে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা থাকলেও ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পিছিয়ে থাকা প্রেসগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের গতি বাড়াতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বাসসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছে দিতে রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রাথমিক স্তরের বইয়ের কাজ এ মাসের মধ্যেই ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ সম্পন্ন হবে। আর মাধ্যমিকের বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি পৌঁছে যাবে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় মাঠপর্যায়ে বই সরবরাহের কোনো জটিলতা তৈরি হবে না।’
তিনি আরও জানান, অতীতে প্রেস ও মাঠপর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ থাকলেও এবার বই বুঝে নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বই গ্রহণের পর মানে কোনো বিচ্যুতি পাওয়া গেলে গ্রহীতা কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে।
সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বাসসকে বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে কোনো নিম্নমানের কাগজের বই সরবরাহ বরদাশত করা হবে না। সরকার বাজারদর যাচাই করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে কেউ কম মূল্যের অজুহাতে নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না পায়। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে এবার কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
প্রেক্ষাপট
প্রথম আলোর ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও মাধ্যমিকের প্রায় ৬৭ শতাংশ পাঠ্যবই সরবরাহ হয়নি; ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র, অনুমোদন ও চুক্তিতে দেরি এবং কাগজসংকটকে এর কারণ বলা হয়।
সংখ্যার হিসাব
একই প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকের জন্য ৮ কোটি ৫৯ লাখের বেশি এবং মাধ্যমিকের জন্য ২১ কোটি ৪৩ লাখের বেশি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপা হয়। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মাধ্যমিকের প্রায় ৩৩.০৬ শতাংশ বই সরবরাহ হয়েছিল।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫