সময়ে বরকত আসে যেভাবে: কোরআন-হাদিসের আলোকে করণীয়
ছবিঃ সংগৃহীত
প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত সেই মানুষ, যে সময়ের কদর বোঝে না। আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠ নিয়ামতগুলোর মধ্যে সময় একটি। সময়ের অপচয় যে করে, তার জীবন থেকেই উঠে যায় সময়ের বরকত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত (ক্ষতিগ্রস্ত): সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
সময় ও সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আগেই তাই সেগুলো কাজে লাগানো জরুরি। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটির আগে মূল্য দাও: বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্বাস্থ্য, দারিদ্র্যের আগে সম্পদ, ব্যস্ততার আগে অবসর এবং মৃত্যুর আগে জীবন।’ (মুসতাদরাক হাকিম, হাদিস: ৭৮৪৬)
কল্যাণ ও প্রাচুর্য—এটাই ‘বরকত’ শব্দের অর্থ। কোনো কিছুতে কল্যাণ, প্রাচুর্য ও স্থায়িত্ব এলে বলা হয় তাতে বরকত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, অর্থে বরকত হওয়া বলতে বোঝায় সেই অর্থ মঙ্গল ও কল্যাণের পথে খরচ হওয়া; পাশাপাশি যে কাজে তা খরচ হলো, সেখানে কল্যাণ বেড়ে যাওয়া এবং তা স্থায়ী হওয়া। সে কারণে জীবনকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সময়ের বরকত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ যুগে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাবে
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইরশাদ, কিয়ামতের আগে সময় যেন দ্রুত অতিক্রান্ত হবে। জ্ঞান কমে যাবে, ভূমিকম্প বাড়বে, ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে এবং হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৩৬)
অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘এমন সময় আসবে যখন এক বছর এক মাসের মতো, এক মাস এক সপ্তাহের মতো, এক সপ্তাহ এক দিনের মতো, এক দিন এক ঘণ্টার মতো এবং এক ঘণ্টা আগুন জ্বালানোর মুহূর্তের মতো মনে হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৩২)
এর ব্যাখ্যায় আলেমদের বক্তব্য, সময়ের বরকত কমে যাওয়া কিংবা বাস্তবেই সময় দ্রুত পার হয়ে যাওয়া—এর অর্থ এমন হতে পারে। ঘণ্টা এখনো ৬০ মিনিটের, দিন ২৪ ঘণ্টার এবং বছর ১২ মাসের; এরপরও অনেকের মুখে শোনা যায়, ‘সময়ই পাই না।’ সময়ের বরকত কমে যাওয়া এর একটি বড় কারণ। সময় সংকুচিত হয়ে যাওয়ার এ রকম কয়েকটি অর্থই আলেমরা করেছেন।
সময়ে বরকত লাভের উপায়
১. সময়ের মূল্য উপলব্ধি করা: মানুষের প্রকৃত মূলধন হলো সময়। দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা মানুষ এই সময়কে কাজে লাগিয়েই অর্জন করে। আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার করা ভালো ও মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত পাবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩০)
২. ভোরে কাজ শুরু করা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়া ছিল, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের সকালবেলার কাজে বরকত দান করুন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২১২) ইবাদত, পড়াশোনা ও কাজ ভোরবেলায় শুরু করা হলে তাতে বরকত মেলে।
৩. সময়ের জবাবদিহির কথা মনে রাখা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন বান্দার দুই পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে—তার জীবন কোথায় ব্যয় করেছে, তার জ্ঞান কী কাজে লাগিয়েছে, তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার শরীর কী কাজে ব্যবহার করেছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
৪. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা: আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি।’ (সুরা সাদ, আয়াত: ২৯) মানুষের সময়, জীবন ও কর্মে বরকত বয়ে আনে কোরআন তিলাওয়াত। অনেক আলেমের অভিজ্ঞতা ছিল, তাঁরা কোরআন যত বেশি পড়তেন, কাজ ততই সহজ ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠত।
৫. সময় নষ্টকারী বিষয় থেকে দূরে থাকা: ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর উক্তি, ‘সময় নষ্ট করা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ; কারণ মৃত্যু তোমাকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে, আর সময়ের অপচয় তোমাকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে।’ সময় নষ্ট হওয়ার কয়েকটি কারণ হলো—অপ্রয়োজনে টেলিভিশন দেখা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো, উদ্দেশ্যহীন গেম খেলা, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, অতিরিক্ত ঘুম বা রাত জাগা, অলসতা এবং কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস।
৬. অল্প সময়কেও কাজে লাগানো: একটি মুহূর্তও নষ্ট হতে দিতেন না সালাফে সালেহিন। অবসর মিললেই কোরআন তিলাওয়াত, জিকির কিংবা ইলম চর্চায় তাঁরা মগ্ন থাকতেন।
৭. নামাজের সময় ধরে দিনের রুটিন সাজানো: সময়ের গুরুত্ব কী, মানুষ তা শেখে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ থেকে; এই নামাজই বিশৃঙ্খল জীবনকে বেঁধে দেয় সুনির্দিষ্ট ও পবিত্র শৃঙ্খলায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর বাণী, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩)
৮. জীবনের অগ্রাধিকার ঠিক করা: ‘ফিকহুল আওলাউইয়্যাত’ বা অগ্রাধিকার বিজ্ঞান নামের একটি পরিভাষা শরিয়তে রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে কোন কাজটি আগে এবং কোনটি পরে করা দরকার, তা সঠিকভাবে বুঝতে পারাকেই বলা হয় অগ্রাধিকার বিজ্ঞান। ইমাম শাফেয়ির বক্তব্য, কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে তালিকা তৈরি করা উচিত বুদ্ধিমান মানুষের—প্রথমে জরুরি ফরজ দায়িত্ব, এরপর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। (কিতাবুল উম্ম: ১/৮৯) সময়ের বরকত এই উপায়েও লাভ করা সম্ভব।
৯. অল্প সময়ে বেশি সওয়াবের সহজ আমল: ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহু আকবার’ একবার বলা একটি সদকার সমতুল্য। কিয়ামতের দিন আমলের পাল্লা ভারী করবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’। আর ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পাঠ করলে জান্নাতে একটি খেজুরগাছ রোপণ করা হয়। (তিরমিজি)
কোরআনের একেকটি অক্ষর পাঠে মেলে অন্তত ১০ নেকি। তিনবার সুরা ইখলাস পড়লে পুরো কোরআন খতমের সমান সওয়াব হয়; ১০ বার পড়লে রয়েছে জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণের সুসংবাদ। জান্নাতের অমূল্য ভান্ডারগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
শেষ কথা হলো, চলে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না—এ কথা স্মরণে রাখা প্রয়োজন। সে জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করতে সচেষ্ট হওয়া উচিত।