
সাশ্রয়ী বিএলডিসি ফ্যানে গ্রীষ্মের পিক চাহিদা কমতে পারে ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট: আইইইএফএ
ছবিঃ সংগৃহীত
প্রচলিত ফ্যানের বদলে বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী ‘বিএলডিসি’ (ব্রাশলেস ডিরেক্ট কারেন্ট) ফ্যান ব্যবহার করা গেলে গ্রীষ্মের পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। গ্রীষ্মে দেশের বাসাবাড়িতে শুধু ফ্যান চালানোর কারণেই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’ (আইইইএফএ)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
আজ সোমবার প্রকাশিত ‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ: রোল অব এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বলছে, সাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহারে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ যেমন কমবে, তেমনি নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার (৪ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের প্রয়োজনও এড়ানো যাবে।
বিএলডিসি ফ্যান আধুনিক ধরনের বৈদ্যুতিক পাখা, যা প্রচলিত এসি ইনডাকশন মোটরের বদলে একটি ব্রাশহীন ডিসি মোটরে চলে। এতে কোনো কার্বন ব্রাশ থাকে না; স্থায়ী চৌম্বক আর একটি ইলেকট্রনিক সার্কিট বোর্ডের সাহায্যে ঘোরে পাখাটি।
আইইইএফএর হিসাবে, গ্রীষ্মের রাতে—বিশেষ করে রাত ৯টায়—ঘর ঠান্ডা রাখতে ফ্যান চালানোর কারণে দেশে বাড়তি ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হয়। ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট রাত ৯টায় দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ (পিক) চাহিদা রেকর্ড হয়েছিল ১৯ হাজার ২৭ মেগাওয়াট।
২৬টি জেলার ৪৩৫টি খানা বা পরিবারে জরিপ চালিয়ে প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, সাধারণ ফ্যান যেখানে ৭০ ওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে, বিএলডিসি ফ্যানে লাগে মাত্র ৩৫ ওয়াট। অথচ দেশে এখন ব্যবহৃত মোট ফ্যানের মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ বিএলডিসি প্রযুক্তির।
প্রতিবেদনের লেখক ও আইইইএফএর লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে নানা সংকট বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) জন্য চাহিদা মেটানো কঠিন করে তুলেছে। বিএলডিসি ফ্যানের ব্যাপক ব্যবহার বিদ্যুতের চাহিদা কমাবে এবং পিডিবির ওপর চাপ হ্রাস করবে।’
গবেষণা বলছে, সব সাধারণ ফ্যান বদলে বিএলডিসি ফ্যান বসানো গেলে বছরে ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে, টাকার অঙ্কে যার মূল্য প্রায় ৮৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন (৮,৯৮৭ কোটি) টাকা।
বিদ্যুৎ বিল কমানোর আগ্রহ থাকলেও ৭৫ শতাংশ পরিবার জানেই না যে বাজারে এমন ফ্যান পাওয়া যায়। সচেতন করার পর ৯৬ শতাংশ গ্রাহক বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছেন, কিন্তু মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর চড়া দাম।
সাধারণ একটি ফ্যান এখন প্রায় ২ হাজার টাকায় মিললেও বিএলডিসি ফ্যানের দাম ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ নিম্ন আয়ের পরিবার, যাদের মাসিক আয় ২৫,০০০ টাকার নিচে, গ্রীষ্মে গড়ে মাসে ৬৬৩ টাকা বিদ্যুৎ বিল দেয়। সরকারি সহায়তা না পেলে বিএলডিসি ফ্যানের বাড়তি দাম উশুল করতে (পে-ব্যাক পিরিয়ড) তাদের লেগে যাবে ৭ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৬ বছর।
দামের এই সমস্যা কাটাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সাতটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আইইইএফএ:
১. জাতীয় কর্মসূচি: সাশ্রয়ী ফ্যান নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় কর্মসূচি তৈরি এবং তা বাস্তবায়নে একটি ‘সুপার এসকো’ (Super ESCO) গঠন।
২. গণসচেতনতা: বিদ্যুৎ ও অর্থ সাশ্রয়ের তথ্য প্রচার করে মানুষকে উৎসাহিত করা।
৩. মান ও লেবেলিং: মাননিয়ন্ত্রক সংস্থা স্রেডা (SREDA)-এর মাধ্যমে ফ্যানের মান নির্ধারণ ও স্টার-লেবেলিং চূড়ান্ত করা।
৪. পাইকারি ক্রয় ও কার্বন রাজস্ব: সরকারিভাবে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ (বাল্ক) ফ্যান কিনে উৎপাদন খরচ কমানো এবং আন্তর্জাতিক কার্বন রাজস্ব তহবিল কাজে লাগিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দাম কমানো।
৫. সহজ অর্থায়ন: বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কিস্তিতে দাম পরিশোধের (অন-বিল ফাইন্যান্সিং) সুযোগ চালু।
৬. কার্যকর বাস্তবায়ন: সুপার এসকোর অধীনে কর্মসূচিটি দ্রুত মাঠে নামানো।
৭. মান নিশ্চিতকরণ: বাজারে আসা পণ্যের মান পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে শক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
শফিকুল আলমের ধারণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ও পাইকারি ক্রয়ের মাধ্যমে বিএলডিসি ফ্যানের দাম নামিয়ে আনা গেলে নিম্ন আয়ের পরিবারের বাড়তি খরচ উশুলের সময় ৪ দশমিক ৮ বছরে নেমে আসবে।
দেশের জ্বালানি খাতের চলমান সংকট সামলাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের চেয়ে দ্রুত চাহিদা কমানোর পদ্ধতিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রেক্ষাপট
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট রাত ১১টায় চাহিদা ১৭ হাজার ১৪০ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হতে পারে ১৪ হাজার ৩১৭ মেগাওয়াট। এতে লোডশেডিং ২ হাজার ৬৯৫ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে — ডেইলি অবজারভার সেদিন এ তথ্য জানায়। পত্রিকাটি আরও জানায়, আগস্টজুড়ে দৈনিক লোডশেডিং বারবার ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
সংখ্যার হিসাব
ইত্তেফাকের ইংরেজি সংস্করণের ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমদানি করা বিদ্যুৎসহ দেশের স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, তখনকার জাতীয় উৎপাদন রেকর্ড ছিল ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিলের ১৬ হাজার ৪৭৭ মেগাওয়াট।
এক নজরে
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নীতি-তথ্যভান্ডারে বলা হয়েছে, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) 'স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড লেবেলিং রেগুলেশন-২০১৮' এর আওতায় সিলিং ফ্যান, এলইডি বাতি, এসি ও রেফ্রিজারেটরের জন্য ন্যূনতম জ্বালানি দক্ষতার মান ও স্টার লেবেলিং চালুর বিধান রয়েছে। কোনো যন্ত্রের মান বাধ্যতামূলক ঘোষণা হলে তা প্রয়োগ করে বিএসটিআই, যাতে মানহীন যন্ত্র বিক্রি না হয়।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: ডেইলি অবজারভার, ২৮ আগস্ট ২০২৬; ইত্তেফাক (ইংরেজি), ২৮ এপ্রিল ২০২৫; আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ), তারিখ উল্লেখ নেই
