
হ্যাকিংয়ের আতঙ্কে বাইন্যান্স থেকে ৩৬০ কোটি ডলার তুলে নিলেন গ্রাহকেরা
ছবিঃ সংগৃহীত
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘বাইন্যান্স’ গতকাল রোববার আবার লেনদেন চালু করার পরপরই প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩৬০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন গ্রাহকেরা। ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার শিকার হওয়ার পর এই প্রথম লেনদেনে ফিরল প্রতিষ্ঠানটি।
হামলার পর সব ধরনের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছিল বাইন্যান্স। ওই হামলায় প্রতিষ্ঠানটি খুইয়েছে ৬৩০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান এ হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৯৫ শতাংশের ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে; বাকি সম্পদের সমপরিমাণ অর্থ জোগাড় করতে আরও সময় লাগতে পারে। হামলাজনিত সব আর্থিক ক্ষতি নিজেরাই বহন করবে বলে প্রতিষ্ঠানটি বারবার জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বাইন্যান্স জানায়, ১ নভেম্বর গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ৪৬৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার উত্তোলনের আবেদন প্রক্রিয়া করেছে তারা। একই সময়ে জমা পড়েছে ১০১ কোটি ডলার। অর্থাৎ নিট হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেরিয়ে গেছে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, শুরুতে উত্তোলনের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গেলেও পরে তা কমে এসেছে এবং প্রত্যাশামতো স্থিতিশীল হচ্ছে। রোববারের নিট উত্তোলন বাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনায় থাকা ১৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারের সম্পদের ২ শতাংশের সামান্য বেশি।
গত সপ্তাহে বাইন্যান্স জানিয়েছিল, হামলার পরের পরিস্থিতি সামলাতে তারা ৬৩০ কোটি ডলারের বেশি তহবিল সংরক্ষণ করেছে। বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের মতো দুই ডজনের বেশি প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সির উত্তোলনও আবার চালু হয়েছে। নিরাপত্তা যাচাই শেষে বাকি সেবাগুলো ধাপে ধাপে চালু করা হবে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের জ্যেষ্ঠ তদন্তকারী অ্যালেক্স জেব্রিক জানিয়েছেন, হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ এখনো নানা মাধ্যমে পাচার হচ্ছে। চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ও বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে কাজ করছেন।
বিবিসির টুডে প্রোগ্রামে অ্যালেক্স জেব্রিক বলেন, ‘আমরা এখনো দেখছি, বেশ সক্রিয়ভাবে অর্থ পাচার করা হচ্ছে। হামলাকারীরা হাজার হাজার ঠিকানায় এসব অর্থ ভাগ করে পাঠাচ্ছে। হাজার হাজার জমার মাধ্যমে অর্থের উৎস আড়াল করার চেষ্টা চলছে।’
হামলার জন্য দায়ী করা হচ্ছে ট্রেডারট্রেইটার নামের উত্তর কোরীয় সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীকে, যা লাজারাস গ্রুপ নামেও পরিচিত। ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো বিনিময় প্রতিষ্ঠান বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরি করেছিল এই গোষ্ঠী; তখন সেটিই ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের সবচেয়ে বড় চুরি।
শনিবার গোষ্ঠীটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটের ঠিকানার তালিকা প্রকাশ করেছে এফবিআই। এসব ঠিকানার লেনদেন আটকাতে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্রিপ্টো সম্পদ জব্দ করতে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করেছে বাইন্যান্স।
গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মধ্য দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। ওই ল্যাপটপে অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা অবৈধ লেনদেনের পথ খুঁজে পায়।
বাইন্যান্সের মতো বিভিন্ন বিনিময় প্ল্যাটফর্মে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা হয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি এক ধরনের ডিজিটাল সম্পদ; নগদ টাকার মতো এর কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রে এসব সম্পদ পরিচালনা ও লেনদেন করা হয়। চীনে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্সের বিশ্বজুড়ে কয়েক শ কোটি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছেন।
প্রেক্ষাপট
এএফপির খবর প্রকাশ করে ওমান অবজারভার ৩০ অক্টোবর জানায়, বাইন্যান্স সেদিন (শুক্রবার) হামলার কথা স্বীকার করে বলে, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার এবং তা আরও বাড়তে পারে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করার কথাও জানায়। ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস 'উচ্চ আস্থার' সঙ্গে হামলার জন্য উত্তর কোরিয়া-সংশ্লিষ্ট ট্রেডারট্রেইটরকে দায়ী করে।
সংখ্যার হিসাব
মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এক সতর্কবার্তায় জানায়, ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি বা তার কাছাকাছি সময়ে বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ভার্চুয়াল সম্পদ চুরি হয়। এর জন্য সংস্থাটি উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: ওমান অবজারভার (এএফপি), ৩০ অক্টোবর ২০২৬; এফবিআই (আইসিথ্রি), ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
