
কংগ্রেসের দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের হাতে, শেষ দুই বছরে কতটা চাপে পড়বেন ট্রাম্প?
ছবিঃ সংগৃহীত
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা; ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে এভাবেই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিকে দেশটির ভোটাররা এত স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করায় ক্যাপিটল হিলে রিপাবলিকান দল ও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব অনেকখানি কমে যাবে। হাউজ ও সিনেট দুই জায়গাতেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর প্রথম দুই বছরের চেয়ে একেবারে আলাদা হবে—এটুকু নিশ্চিত। প্রশ্ন হলো, কংগ্রেসে ফিরে পাওয়া এ ক্ষমতা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ঠিক কতটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবেন।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সরকারের কাজের ওপর তদারকি ও অনুসন্ধানের নতুন দুয়ার খুলছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে। দেশজুড়ে রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক জয় পেয়ে দলটি প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের সীমা ছাড়িয়েছে, আর পরবর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা হতে যাচ্ছেন হাকিম জেফ্রিস। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন না পেলে রিপাবলিকানরা আর কোনো আইন পাস করাতে পারবে না। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হাউজ কমিটি ট্রাম্প প্রশাসনের নানা সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের তদন্ত শুরু করতে পারবে, প্রাসঙ্গিক নথি ও সাক্ষ্য চাইতে পারবে, প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও কংগ্রেসের ধারাবাহিক নজরদারিতে আনতে পারবে। দলের নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তির দিক থেকে ট্রাম্পকে তৃতীয়বার অভিশংসনের জোরালো চাপও তৈরি হতে পারে।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ডেমোক্র্যাটদের হাতে আসছে। মার্কিন ক্যাবিনেট কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত এবং সুপ্রিম কোর্টসহ সব স্তরের ফেডারেল বিচারকের নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন লাগে। সিনেট নিয়ন্ত্রণে থাকায় ট্রাম্পের এসব প্রধান নিয়োগ আটকে দেওয়া বা পিছিয়ে দেওয়ার পথ সহজ হবে। তাতে যেকোনো নতুন আইন পাস করাতে হোয়াইট হাউসকে সমঝোতা আর দরকষাকষির পথে হাঁটতে হবে।
দুই কক্ষ হাতে আসার পর কোন কোন বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত গড়াবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিতও মিলেছে। হাউজ ওভারসাইট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট রবার্ট গার্সিয়ার অগ্রাধিকার তালিকার একেবারে ওপরে আছে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক লেনদেন ও সম্ভাব্য দুর্নীতি। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে প্রতিনিধি জামিল রাসকিন এরই মধ্যে অনুরোধ পাঠিয়েছেন।
তদন্তের আরেক বড় ক্ষেত্র হবে জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। রো খান্না ও থমাস ম্যাসির যৌথ চেষ্টায় গত বছর এপস্টেইন-সংক্রান্ত মিলিয়ন মিলিয়ন ফাইল প্রকাশে বাধ্য হয়েছিল বিচার বিভাগ। কিন্তু আইনে বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পেরোনোর পর বিভাগটি হাতে থাকা ৬০ লাখ পৃষ্ঠার মধ্যে কেবল ৩৫ লাখ পৃষ্ঠা সামনে আনে, বাকিগুলোকে বলে প্রতিলিপি। ফাইলে অতিরিক্ত কালো করে ঢেকে দেওয়া অংশ (রেড্যাকশন) আর কোথাও কোথাও দুর্ঘটনাবশত ভুক্তভোগীদের নাম বেরিয়ে যাওয়ায় দুই দলেই ক্ষোভ ছড়ায়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাংবাদিক কেটি ফাং বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে মামলাও করেছেন। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসেও চেয়ারম্যান জিম কোমারের নেতৃত্বে ওভারসাইট কমিটি অনেক ক্ষেত্রে দুই দলের ঐকমত্য নিয়েই কাজ করেছে; সাক্ষী হাজির করাতে সমন জারি করেছে, আদালত অবমাননার প্রস্তাবও নিয়েছে। নতুন ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসেও এ ধারা চলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিভাগ আর সামরিক বাজেটও থাকছে ডেমোক্র্যাটদের নজরে। হাউস আর্মড সার্ভিসেস ও ইন্টেলিজেন্স কমিটির সদস্য জেসন ক্রো জানিয়েছেন, তাঁর তদন্ত শুরু হবে পেন্টাগন দিয়েই, কারণ পেন্টাগনের সামরিক বরাদ্দ বা ডিফেন্স ফান্ড ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত কোম্পানিগুলোতে ব্যবহারের সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে। অভিশংসনের প্রশ্নে হাকিম জেফ্রিস পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটরা সে সম্ভাবনা কোনোভাবেই উড়িয়ে দিচ্ছে না। রিপাবলিকান হাউজ লিডার স্টিভ স্ক্যালিসের আশঙ্কা, ক্ষমতা নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালেও বিশাল ‘নীল ঢেউ’ তুলে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস দখলে নিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। সে সময়ও প্রতিনিধি পরিষদের কমিটিগুলো তাঁর ব্যবসা, রাশিয়া-সংক্রান্ত তদন্তে তাঁর ভূমিকা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বহু অনুসন্ধান চালায়। সেবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক বছরের কিছু বেশি সময় পর, দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব নেয় ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হাউজ; পরে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে তিনি খালাস পান। ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে ৬ জানুয়ারির হামলার ঘটনায় তিনি দ্বিতীয়বার অভিযুক্ত হন, সেবারও সিনেট তাঁকে অব্যাহতি দেয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
প্রেক্ষাপট
আল জাজিরার ৪ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ২২০, ডেমোক্র্যাটদের ২১৫; সিনেটে রিপাবলিকান ৫৩, ডেমোক্র্যাট ৪৭।
সংখ্যার হিসাব
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ৪ নভেম্বর পর্যন্ত হিসাবে, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ২২৮টি আসনে জিতেছেন, এগিয়ে আছেন আরও ৩৪টিতে; সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের জয় ৫৪টি আসনে, রিপাবলিকানদের ৪৪টিতে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য লাগে ৫১টি আসন — আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
এক নজরে
অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (এবিসি) ৪ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবনির্বাচিত কংগ্রেস শপথ নেবে ৩ জানুয়ারি।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: আল জাজিরা, ৪ নভেম্বর ২০২৬; এবিসি নিউজ (অস্ট্রেলিয়া), ৪ নভেম্বর ২০২৬
