একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবার আর্তনাদ: ‘আমার বাচ্চা ফেরত দেন’
ছবিঃ সংগৃহীত
‘জীবন শুধু ফলাফলে মাপা যায় না, হৃদয়ের আনন্দ, সাহস, মমতা আর ভালোবাসাই জীবনের আসল অর্জন।’—প্লে গ্রুপ থেকে ছেলে নার্সারিতে ওঠার আনন্দে তার ছবি দিয়ে ফেসবুকে এ কথা লিখেছিলেন বাবা মৃদুল ইসলাম। একমাত্র ছেলে আভানকে নিয়ে তাঁর এই গর্বের লেখা মাত্র কয়েক দিন আগের। লেখার শেষে ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে তিনি যোগ করেছিলেন, ‘বাবা তোমাকে ভালোবাসে এবং তোমাকে নিয়ে গর্বিত।’
সেই শিশুটি আজ আর বেঁচে নেই। সাড়ে চার বছরের আভান শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে।
একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে মৃদুল ইসলাম ভেঙে পড়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ আর দায়িত্বশীল চিকিৎসক না থাকার কারণেই তাঁর ছেলে মারা গেছে।
মৃদুল বলেন, ‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না।’
সন্তানকে হারানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আরও বলেন, ‘আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। সে নাই, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’
মৃদুল জানান, আভানকে নিয়ে পরিবারের অনেক পরিকল্পনা ছিল। তিনি বলেন, ছেলেকে স্কুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি আরও জানান, আভানকে সব সময় নিজের কাছে রাখতেন, তার সঙ্গেই ঘুরতেন।
আভানের বাবার দাবি, হাসপাতালে থাকাকালে সে স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া-দাওয়া করছিল। পরিবারের সদস্যরা বাসা থেকে খাবার নিয়ে যেতেন তার জন্য। তিনি জানান, শিশুটি তাঁকে ফোন করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছিল।
পারিবারিক সূত্র জানায়, জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ডেঙ্গু সন্দেহ করে চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা শুরু করেন।
পরিবারের অবশ্য দাবি, হাসপাতালে একাধিকবার পরীক্ষা করানোর পরও ডেঙ্গুর ফল এসেছে নেগেটিভ। স্বজনদের অভিযোগ, তা সত্ত্বেও ডেঙ্গু ধরে নিয়েই চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হয়।
আভানকে আইসিইউতে নেওয়া হয় ২ অক্টোবর। পরিবার অভিযোগ করেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেখানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। তাঁদের দাবি, টেলিফোনে পাওয়া নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই শিশুটির চিকিৎসা চলছিল।
স্বজনরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের বলেছিল যে শিশুটির শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু পরদিন শনিবার বিকেল ৫টার দিকে মারা যায় আভান।
পরিবার অভিযোগ করেছে, চিকিৎসা চলাকালে আভানকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল অতিরিক্ত মাত্রায়। স্বজনদের দাবি, এর পর তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে ‘শক সিনড্রোম’ দেখা দেয় এবং শিশুটি মারা যায়।
পরিবারের আরও অভিযোগ, চিকিৎসার কেস সামারিসহ প্রয়োজনীয় মেডিকেল নথি পাওয়ার ক্ষেত্রেও শুরুতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা মেলেনি। পরবর্তী সময়ে এসব নথি তাঁরা সংগ্রহ করেন।
স্বজনরা দাবি করেছেন, শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিনড্রোমের তথ্য ওই মেডিক্যাল নথিতে মিলেছে। পরিবার মনে করছে, এসব তথ্যের আলোকে ভুল চিকিৎসার অভিযোগটি আরও খতিয়ে দেখা দরকার।
আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম পেশায় গণমাধ্যমকর্মী। ঘটনাটি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত হচ্ছে পরিবার।
স্বজনরা শিশুটির মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন। একমাত্র সন্তান হারানো শোকাহত পরিবারটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছে।