কৃষি কার্ড থেকে ১৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতাল—রাজশাহীর জনসভায় একগুচ্ছ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
ছবিঃ সংগৃহীত
রাজশাহীর মাদ্রাসামাঠে আজ মঙ্গলবার বিকেলে অনুষ্ঠিত জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই দেশের ৪০ লাখ কৃষকের হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। আখচাষিদের জন্য নেওয়া প্রণোদনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছি, যাতে আগামী মৌসুম থেকে কৃষকদের আখচাষে কষ্ট কম হয়। কেন প্রণোদনা দেওয়া হলো? কারণ বিএনপি বিশ্বাস করে, এই দেশের কৃষি বাঁচলে, কৃষক বাঁচলে—এই দেশ বাঁচবে।’
নির্বাচনের সময়কার অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠন করতে পারলে বিএনপি কৃষকের পাশে দাঁড়াবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল; সঙ্গে বলা হয়েছিল, সরকার গঠনের সাত দিনের মধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। সেই অনুযায়ী সাত দিনের মধ্যেই ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
কার্ডটি কেমন হবে, তা ব্যাখ্যা করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা কৃষক ভাইদেরকে একটি কার্ড দিতে চাই, যার নাম ফারমার্স কার্ড বা কৃষি কার্ড। ইতিমধ্যে এর কাজ শুরু হয়েছে। আগামী কিছু দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে। তারপর ধীরে ধীরে আমরা কৃষক ভাইদের কাছে কার্ডগুলো পৌঁছানোর চেষ্টা করব। আমরা ৪০ লাখ কৃষকের কাছে কার্ড পৌঁছে দেব এ বছরেই।’
সুবিধার দিক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বছরে দুই বা তিনটি ফসল ফলান এমন কৃষকের অন্তত একটি ফসলের সার-বীজ কার্ডের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা হবে, যাতে তাঁদের কষ্ট কমে আসে। এই কার্ড দিয়ে বীমা করা যাবে, সহজে ব্যাংকঋণ নেওয়া যাবে, এমনকি পরদিন বৃষ্টি হবে কি না সেই তথ্যও মিলবে; ফলে বীজ বপন কিংবা সার প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
পাঁচ বছরে খনন হবে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল
কৃষকের সেচসুবিধা নিশ্চিত করতে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে; এর মধ্যে আট মাসেই খনন হয়েছে ৮০০ কিলোমিটার। এতে কৃষকেরা সেচসুবিধা পাবেন, পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ হবে। তিনি বলেন, এই উত্তরাঞ্চল তো দেশের শস্যভান্ডার। এখানে যেমন পানির কষ্ট হয়, অন্যখানেও হয়। শহীদ জিয়ার সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এই যে বরেন্দ্র প্রকল্প, সেটা শহীদ জিয়ার সময় কার্যকর হয়েছিল।
পদ্মা ও তিস্তার পানিসংকট নিয়েও কথা বলেন তারেক রহমান। পদ্মা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ কারণে তিস্তা ও পদ্মায় ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পানির সমস্যা যারা তৈরি করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলা হবে; বাংলাদেশের পানির হিস্যা আদায়ে যতদূর যেতে হয়, সরকার সেই চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে ব্যারাজ নির্মাণের কাজ যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা হবে।
উপজেলা হাসপাতাল হবে ১৫০ শয্যার
গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার সিদ্ধান্তের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের সরকার; তাই জনগণের কথা ভেবেই প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেড বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন ৫০ বেডের হাসপাতাল আছে। ৩০ বেড করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি রেখে গেছেন ৩০ বেড, ১৯৯১ সালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আরও ২০ বেড বাড়িয়েছিলেন। এবার যেহেতু বিএনপি সরকার গঠন করেছে, সে জন্য প্রত্যেক হাসপাতাল ৫০ বেড থেকে ১৫০ বেডে উন্নীত করব।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘আমরা স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। আমরা শিশুদের জন্য বেড রাখব। মা-বোনদের জন্য আলাদা বেড রাখব। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করব, যাতে এতদূর আসতে না হয়।’ তিনি আরও জানান, গত জুনে উপস্থাপিত বাজেটে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো হয়েছে এবং হৃদরোগীদের চিকিৎসাসরঞ্জামের ওপর কর কমানো হয়েছে। আগে হার্টের রোগীদের যে সরঞ্জামের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাগত, তা এখন ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।
ডিসেম্বরের মধ্যে ৪৬টি বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ
বন্ধ মিল-কারখানা চালুর জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। ইতিমধ্যে বন্ধ ছয়টি মিল-কারখানা উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা সেগুলো চালু করতে পারেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশে বন্ধ থাকা প্রায় ৪৬টি কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য শ্রমিকদের বেকারত্ব দূর করা।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ ধরে রাখার ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার দেশে নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং বেকারত্বের অভিশাপ কমিয়ে আনতে চাইছে; দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
তবে কিছু রাজনৈতিক দল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যদি উপজেলা হাসপাতালে বেড না বাড়ে, মিল-কারখানা চালু না হয়, খাল খনন না হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কে? আমার প্রশ্ন, যারা এমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করতে চায়, যাতে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে কি তারা জনগণের বন্ধু হলো? খাল খনন কর্মসূচি কি জনগণের কর্মসূচি নয়?’
নারীদের অনার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনা
নারীশিক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন; এবার বিএনপি সরকার অনার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী ভালোভাবে পড়াশোনা করবেন, তাঁদের উপবৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এতে তাঁরা সন্তানদের ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবেন, জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবেন এবং ছোট ছোট বিনিয়োগ করতে পারবেন। তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একটি পরিবারকে মায়ের নেতৃত্বে আত্মনির্ভরশীল করতে চাই। এভাবে একটি গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল হবে।’
বক্তব্যে বিএনপির গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া যেন কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘বিদেশ থেকে কেউ এসে আমাদের দেশ গড়ে দিয়ে যাবে না। কষ্ট করে আমাদেরই গড়তে হবে। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত দিয়ে কষ্ট করে আমাদের এই দেশ গড়তে হবে।’
জনগণের সমর্থনই যে বিএনপি সরকারের শক্তি, সে কথা উল্লেখ করে ভাগ্য পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের পরিচালনায় বক্তব্য দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল, শফিকুল হক মিলন, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন প্রমুখ।
উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম এমপি, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা, কৃষকদলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন প্রমুখসহ অন্যরা।
প্রেক্ষাপট
কৃষক কার্ডের পরিকল্পনা নতুন নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল এবং প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮১ কোটি টাকা — প্রথম আলো ২২ মার্চ ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছিলেন, কার্ডের মাধ্যমে প্রণোদনা, ভাতা ও ভর্তুকি পাওয়া সহজ হবে; কর্মসূচিটি পয়লা বৈশাখে চালুর পরিকল্পনা ছিল।
কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তটি হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারিতে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির বরাতে জানা যায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় — আমার বার্তা ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে।
সংখ্যার হিসাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এই শ্রেণির কৃষকদের কাছে ব্যাংকের পাওনা ছিল সুদসহ প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবং সিদ্ধান্তটিতে সরাসরি উপকৃত হবেন বলে ধরা হয়েছিল প্রায় ১২ লাখ কৃষক — আমার বার্তা ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আজ জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত ১৩ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
চলতি বছরের জন্য ঘোষিত ৪০ লাখ কার্ড সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রার একটি অংশ; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চার বছরের পরিকল্পনায় মোট সংখ্যা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৬৫ লাখ — প্রথম আলো ২২ মার্চ ২০২৬ এ তথ্য জানিয়েছে।
এক নজরে
কৃষক কার্ড হলো কৃষকের পরিচয় ও সেবাপ্রাপ্তির একটি সমন্বিত কার্ড। প্রথম আলোর ২২ মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুতে কার্ডধারীদের ১০ ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল—ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি, সরকারি প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে সেচ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, শস্যবিমা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যে বিক্রি, কৃষি প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য এবং রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে পরামর্শ। মৎস্যচাষি ও খামারিরাও কার্ডের আওতায় আসার কথা রয়েছে।
সূত্র
প্রেক্ষাপট সূত্র: প্রথম আলো, ২২ মার্চ ২০২৬; আমার বার্তা, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, আজকের পত্রিকা