গুমের শিকার পরিবারগুলোর কথা শুনল সংবিধান সংশোধন কমিটি, প্রতিরোধে সংবিধান ও আইনে ব্যবস্থার আশ্বাস
ছবিঃ সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অভিজ্ঞতা শুনেছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। বৈঠক শেষে কমিটি জানায়, সামনে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হেফাজতে মৃত্যু ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব বিষয় সংবিধানে রাখা দরকার, সেগুলো সংবিধানে যুক্ত হবে; আর যা আইন, বিধি ও বিধানের মাধ্যমে করা সম্ভব, সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে কমিটির বৈঠক হয়। বেলা আড়াইটায় শুরু হওয়া বৈঠকটি শেষ হয় বিকেল ৪টার পরে। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি জানান, মতবিনিময়ে সবার কাছ থেকে একই কথা এসেছে—ভবিষ্যতে যেন দেশে আর কেউ গুম না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। গুম নিয়ে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার চাওয়া হয়েছে। গুম হয়ে যাঁরা এখনো ফেরেননি, তাঁদের পরিবার সহায়তার আবেদনও জানিয়েছে। সরকার এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিজেও একসময় গুমের শিকার হয়েছিলেন জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে যেন সেই সময় আর কখনো না ফেরে, সেটাই তাঁদের চাওয়া। গুমের অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হোক—এটাই তাঁরা চান। দেশে আর কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হবে না, কেউ গুম বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবে না, কারা হেফাজতে কারও মৃত্যু হবে না—এমন বাংলাদেশের আশাতেই ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছে। তাঁদের আবেদন সরকার যথাযথভাবে রক্ষা করবে। যা সংবিধানে রাখা দরকার, তা সংবিধানে রাখা হবে, আর যেখানে আইন-বিধি দরকার, সেগুলো তৈরি করা হবে।
গুম প্রতিরোধে সংবিধানে নতুন কোনো বিধান যোগ করার চিন্তা আছে কি না—সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। এ বিষয়ে সংবিধানে যথেষ্ট স্বীকৃতি আছে।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে কমিটির সভাপতি বলেন, বিরোধী দল রাস্তায় আন্দোলন করছে। নিজেদের দাবি নিয়ে তারা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে এলে কমিটি তাদের কথা শুনতে পারত। কিন্তু রাস্তার আন্দোলনকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই ব্যবস্থা চালু করতেই হবে। কোন পদ্ধতিতে সরকার গঠিত হবে, রূপরেখা কেমন হবে, কীভাবে করলে বিতর্ক এড়ানো যাবে—সবই কমিটি যাচাই করবে। পরে জাতীয় সংসদে বিল উঠলেও এ নিয়ে বিতর্ক হবে, নানা পরামর্শ ও প্রস্তাবও আসতে পারে।
পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) ক্রসফায়ারসংক্রান্ত মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আইজিপির মন্তব্যের ব্যাখ্যা পরে দেওয়া হয়েছে। আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলতে গিয়ে হয়তো অসতর্কভাবে তিনি ওই শব্দটি বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, এ ধরনের শব্দচয়ন সঠিক নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বিএনপি সরকারের আট মাসে কোনো ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। একটি অভিযোগ এসেছে, সেটি সরকার তদন্ত করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও স্বাধীনভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা প্রশ্ন তুললে তাদেরও তদন্তের আহ্বান জানানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত কেউ ‘ম্যাটেরিয়াল’ অভিযোগ দেয়নি।
বর্তমান বিরোধী দলের যাঁরা গুম হয়েছিলেন, তাঁদের বৈঠকে ডাকা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু তিনি আসেননি।
সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও তাহসিনা রুশদীর সভায় নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং আইনি সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা তুলে ধরেন। এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপের ওপর জোর দেন তাঁরা। সভা থেকে গুম প্রতিরোধ, বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অগ্রাধিকার দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি ওঠে।
কমিটির সদস্যদের মধ্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বৈঠকে ছিলেন।
প্রেক্ষাপট
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬ ওই দিন রাতে কণ্ঠভোটে সংসদে পাস হয়। আইনে গুমের ঘটনার মূল তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া হয়েছে, অথচ এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এই ক্ষমতা ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬