নকশাবহির্ভূত ভবন নিয়ে নতুন বিধিমালা এক মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে
ছবিঃ সংগৃহীত
সরকার দেশের বড় শহর থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে; লক্ষ্য অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসা। একই সঙ্গে জোরদার করা হচ্ছে সেই ব্যবস্থাও, যার আওতায় স্থাপত্য, কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক পরিকল্পনা একসঙ্গে সমন্বয় করে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয় এবং নির্মাণ শেষে দেওয়া হয় অকুপেন্সি সার্টিফিকেট।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নগর ও আবাসন ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি কাজে হাত দেওয়া হয়েছে। আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল এবং ইলেক্ট্রো প্ল্যানিং—এর সব কিছুই এখন সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তার মতে, নকশা অনুমোদনের পর কোনো ভবন নির্মাণের সময় অনুমোদিত সেই নকশা ঠিকঠাক মানা হলো কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে ভবনটি অনুমোদিত পরিকল্পনা মেনেই নির্মিত হয়েছে কি না, অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ডিজাইনারদের দিয়ে তা প্রত্যয়ন করানোর ব্যবস্থা করা হবে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় নগর উন্নয়ন ও আবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত সাত মাস ধরে বেশ কিছু কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, আরবান ডেভেলপমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইউডিডি) প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মাধ্যমে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের কাজ পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এগিয়ে নেওয়া হবে। প্রথম দিকে গুরুত্ব পাচ্ছে মেট্রোপলিটন শহরগুলো। পরে বড় শহর থেকে উপজেলা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকার বাস্তবভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, প্রতিটি এলাকার প্রয়োজন ও সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে জোনিং করা হবে; এর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কোন জায়গায় কী ধরনের স্থাপনা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা কিংবা অন্যান্য ব্যবহার হবে।
তার ভাষায়, মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো অনেকটা একটি লক্ষ্যবস্তুর দিকে চারটি তীর ছোড়ার মতো ব্যাপার। সেগুলোর কোনো একটি হয়তো লক্ষ্যে লাগতে পারে। তবে পরিকল্পিত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এভাবে এগোনোর সুযোগ নেই; সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাকে ভিত্তি করেই কাজ করতে হবে। সে কারণেই ইউডিডিকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং এই বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চলছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, সঠিক পরিকল্পনার জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দেশের সর্বশেষ জনশুমারিটি হয়েছে অনেক আগে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতি, জনসংখ্যা, বসতি, আবাসন ও নগরায়ণের প্রকৃত চিত্র জানার জন্য নতুন করে একটি উপযুক্ত শুমারি করা দরকার। সেই শুমারি থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করা যাবে।
ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজধানীর ধানমন্ডিসহ রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ভবনের নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে রাজউকের মাধ্যমেই। কিন্তু এসবের বাইরে অনেক এলাকায় ভবন গড়ে তোলা হয়েছে অনুমোদিত পরিকল্পনা ছাড়াই। সেই ভবনগুলো চিহ্নিত করার কাজ বর্তমানে চলছে।
রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকার পরিবেশ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি। জাকারিয়া তাহের আরও জানান, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ছয়বার বৈঠক করেছেন।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর রয়েছে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায়। এগুলোর মধ্যে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বাড়িতেই নির্মাণের সময় যে সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল থাকার কথা ছিল, তা করা হয়নি। অনেক নামিদামি ডেভেলপারও একইভাবে ভবন নির্মাণ করেছেন, অথচ বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপির ব্যবস্থা করেননি।
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা হয়েছে, পাশাপাশি গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে। এসব বৈঠকে অংশ নেন রাজউক চেয়ারম্যান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা।
জাকারিয়া তাহের বলেন, গুলশান ও বারিধারার মতো এলাকা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত এলাকা। এসব এলাকার লেকের পানি ও পরিবেশই ঠিক রাখা না গেলে গোটা দেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা উন্নত করার কাজটি আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, নগর উন্নয়নে সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ আছে এবং এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনাও মিলছে। দেশের কল্যাণে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর যেকোনো পরামর্শ পেলে জনগণ থেকে নির্বাচিত সরকার তা গ্রহণে আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
নতুন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠনের কথাও জাকারিয়া তাহের জানান; এর লক্ষ্য নগর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা। তিনি বলেন, গত সাত মাসে রাজউকের আদলে নতুন ছয়টি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠিত হয়েছে ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশালে। আগে থেকে আরও চারটি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ছিল। পর্যায়ক্রমে বগুড়াসহ অন্যান্য এলাকাতেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, যে এলাকায় ডেভেলপমেন্ট অথরিটি নেই, সেখানে নকশা অনুমোদন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব অনেক সময় সিটি করপোরেশনের ওপরই পড়ে। এর ফলে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালান্সে ঘাটতি তৈরির আশঙ্কা থাকে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও এর উদাহরণ আছে। বসিলাসহ কিছু এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায় থেকে ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এই বিষয়গুলোকে একটি সামগ্রিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, অনুমোদিত নকশা ছাড়া যেসব ভবন নির্মিত হয়েছে কিংবা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে যেসব স্থাপনা নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও নতুন বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। সেটি আগামী এক মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিধিমালাটি অনুমোদন পেলে ভবন নির্মাণ ও তদারকির আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে।
আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে জাকারিয়া তাহের বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ব্যাপকভাবে আবাসন নিশ্চিত করতে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৩০ বছর মেয়াদি মর্টগেজ সুবিধা আছে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে। এমন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা না থাকলে বাংলাদেশেও বৃহৎ পরিসরে আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন।
তিনি আরও জানান, বেসরকারি খাত এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এলে তাদের সহযোগিতা করবে সরকার।
জাকারিয়া তাহের বেসরকারি আবাসন খাতের নীতিমালাতেও পরিবর্তন আনার কথা বলেন। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে এবং তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন নীতিমালা তৈরি হয়েছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি আবাসন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে নির্ধারিত পরিকল্পনা ও শর্তের মধ্যেই। পরবর্তী পরিকল্পনা অনুমোদনের বিষয়টি আগের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তার ওপরও নির্ভর করবে।
তিনি জানান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করতে বেসরকারি আবাসন খাতকেও আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকার বাসযোগ্যতার প্রসঙ্গে জাকারিয়া তাহের বলেন, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকা রয়েছে ১৭১তম অবস্থানে। এ কারণে রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তুলতে সরকারকে নানা ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবে অতিরিক্ত জনঘনত্বের কারণে কাজটি সহজ নয়। যথাযথ পরিকল্পনা এবং এর পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ না থাকলে এ উদ্যোগ সফল করা কঠিন।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, বাংলাদেশের আবাসন বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রীও তুলে ধরেছেন গত ৫ অক্টোবর বসতি দিবস উপলক্ষে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তবু প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান নিয়ে টিকে থাকতে চাইলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সামনে এগোতে হবে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, পরিবেশ রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনবান্ধব আবাসন নীতি বাস্তবায়নে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণও জরুরি। মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখলে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গড়া সম্ভব হবে।