পেঁয়াজে দেশের তৃতীয় রাজবাড়ীতে আগাম মুড়িকাটার আবাদ শুরু, বিনা মূল্যে বীজ-সার দেওয়ার উদ্যোগ
ছবিঃ সংগৃহীত
আমদানিনির্ভরতা কমানো আর ঘাটতি পূরণে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশে তৃতীয় অবস্থানে থাকা রাজবাড়ীতে এবার আবাদ বাড়ানো ও ফলন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
চলতি মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলায় হালি, মুড়িকাটা ও কদম পেঁয়াজ মিলিয়ে ৪০ হাজার ৯শ’ ৩২ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। কৃষকদের উৎসাহ দিতে বিনা মূল্যে বীজ, সার ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। হালি পেঁয়াজের চাষ শুরু হবে আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে, তবে বিভিন্ন এলাকায় আগাম মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, গত বছর জেলায় ৪০ হাজার ৯শ’ ৩২ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছিল। এবারও রাজবাড়ী সদর, গোয়ালন্দ, পাংশা, কালুখালী ও বালিয়াকান্দি উপজেলায় একই পরিমাণ জমিতে আবাদের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এর মধ্যে হালি পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ৩৪ হাজার ৭শ’ ৭৮ হেক্টর, মুড়িকাটার ৬ হাজার ১৩ হেক্টর এবং কদম পেঁয়াজের ১শ’ ৪১ হেক্টর।
পাঁচ উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯ শ’ ৩৩ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ লাগানো হয়েছে। গোয়ালন্দে ৯ শ’ ১১ হেক্টর, কালুখালীতে ৭ শ’ ৫০ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ১ শ’ ৫০ হেক্টর, পাংশায় ৮০ হেক্টর এবং রাজবাড়ী সদরে ৪২ হেক্টরে এ চাষ হয়েছে। আগাম পেঁয়াজে এগিয়ে আছে গোয়ালন্দ ও কালুখালী।
গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর এলাকার কৃষক হাবিল মন্ডল বাসসকে বলেন, ‘পেঁয়াজ আমাদের এলাকার অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। এ ফসলের আবাদ করে অনেক কৃষক তাদের সংসারের খরচ চালান। তবে বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে। সময়মতো প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ ও সরকারি সহায়তা পেলে আমরা আরও বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করতে পারব। উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা পেঁয়াজ চাষে আরও উৎসাহিত হবেন বলে মনে করি।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের নয়নসুখ গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফার কথা, ‘পেঁয়াজ চাষে ভালো ফলন পেতে সময়মতো জমি প্রস্তুত, উন্নতমানের বীজ ব্যবহার এবং সঠিক পরিচর্যা জরুরি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে তারা আরও উপকৃত হবেন।’
দেশের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা হওয়ায় এ ফসল রাজবাড়ীর কৃষি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। লক্ষ্য অনুযায়ী আবাদ হলে উৎপাদনে জেলার অবস্থান ধরে রাখা ও আরও মজবুত করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে উৎপাদন খরচ কমানো, ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণ ও বাজারজাতের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নাইম আহম্মেদ বাসসকে বলেন, পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সারা বছর নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন কমে গেলে, সংরক্ষণ বা পরিবহনে সমস্যা হলে কিংবা বাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে দাম বেড়ে যেতে পারে। তাই আগাম মুড়িকাটার আবাদ ও উৎপাদনের পাশাপাশি সময়মতো হালি পেঁয়াজের চাষ নিশ্চিত করায় জোর দেওয়া দরকার।
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এনামুল হক বাসসকে জানান, পেঁয়াজ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠপর্যায়ে কাজ জোরদার করা হয়েছে, আবাদ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। বিনা মূল্যে বীজ, সার ও প্রণোদনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদনে আরও গতি আসবে বলে তাঁর আশা।
আগাম মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ শুরু হওয়ায় এ মৌসুমের প্রাথমিক অগ্রগতি চোখে পড়ছে। ফেব্রুয়ারি-মার্চে হালি পেঁয়াজের আবাদ শুরু হলে পুরো উৎপাদন পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে, সময়মতো চাষ হলে আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সম্ভাবনা বাড়বে।
জেলার প্রেক্ষিত
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২৫ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তখনকার উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, সে বছর জেলায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়ে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়; তখনো কৃষকের ঘরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন পেঁয়াজ মজুত ছিল এবং দাম কম থাকায় কৃষকেরা হতাশ ছিলেন।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাসস
প্রেক্ষাপট সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৫ জুন ২০২৬