নগদে ৬৭৫ কোটির ঘাটতি দাবি, ক্রসফায়ার প্রশ্নে সরকারের অনুমতির কথা বললেন আইজিপি
ছবিঃ সংগৃহীত
প্রয়োজন পড়লে এবং সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ক্রসফায়ারও করবে—এমন মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
আইজিপির ভাষায়, ‘কে আসবে, কবে আসবে, কী হবে, ওইটা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব আইন সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ারের যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি এলাউ (অনুমতি) করে আমরা (পুলিশ) সেটাই করব।’
চকবাজারে ‘কমিউনিটি ব্যাংক’-এর ইসলামিক ব্যাংকিং সেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় আজ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে। সেখানেই তিনি এসব কথা বলেন।
পুলিশের অবস্থান বোঝাতে আইজিপি বলেন, ‘আমরা যদি লাঠিপেটা করি, বলবেন আমরা ফ্যাসিস্ট পুলিশ। আর আমরা যদি নীরবে থাকি, তাহলে বলবেন দুর্বল পুলিশ। তাহলে আমাকে তো কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে, এমপাওয়ার করতে হবে।’
তিনি যোগ করেন, ‘যত বাহিনী বলি-না কেন, আপনারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে হলে এই পুলিশ, পুলিশের কোনো বিকল্প নাই। সেনাবাহিনী দেশ রক্ষা করবে, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। আর ইন্টারনাল শৃঙ্খলা-শান্তি-সমৃদ্ধি-অর্থনৈতিক উন্নয়ন সবকিছু আপনার-আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করেনি বলে দাবি করেন আইজিপি। তাঁর কথা, ‘আমরা কোনো আনওয়ান্টেড ফোর্স অ্যাপ্লাই করি নাই। আপনারা দেখেছেন জুলাই অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের যে পুলিশের অবস্থা ছিল, পুলিশ রাস্তায় ডিউটি করার জন্য ভয় পেত, তারা যেতে সাহস পেত না, সেই অবস্থা থেকে আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার পথে। আপনাদের (জনগণের) প্রকৃত স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেওয়ার জন্য, আপনার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই জায়গায় আপনারা সহযোগিতা করুন।’
ব্যাংকে গ্রাহকের টাকার নিরাপত্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও জবাবদিহি, পুলিশের দায়িত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা—এসব নিয়ে বলতে গিয়েই আইজিপি এ মন্তব্যগুলো করেন। তিনি বলেন, ‘আইন ও সংবিধান অনুযায়ী পুলিশকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘আপনারা পুলিশকেও ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করবেন না, নিজেরাও ব্ল্যাকমেলড হবেন না।’
গুজব আর মিথ্যা তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে আসল ঘটনা চিহ্নিত করা এবং তার প্রতিকারে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও জানান আইজিপি।
বাহিনীর ভেতরে অপরাধে জড়ানো সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর হিসাবে, গত দুই মাসে প্রায় ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অতীতে মাদক কারবারে রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের কিছু সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগের কথাও তোলেন তিনি।
আইজিপির মতে, সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে। পুলিশকে অকার্যকর রেখে সব দায় তাদের ঘাড়ে চাপালে কাঙ্ক্ষিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আসবে না।
তিনি বলেন, ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন—এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন।’
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনের কথাও বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো সদস্য অপরাধ করার পরও ব্যবস্থা না নিলে পুলিশকে জবাবদিহি করতে হবে। আবার মিথ্যা অভিযোগ ও গুজবের ওপর ভর করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মূল্যায়ন করাও ঠিক নয়।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদের ইলেকট্রনিক অর্থের বিপরীতে যথেষ্ট নগদ টাকা রাখা আছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন আইজিপি। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের এক হাজার কোটি টাকার ইলেকট্রনিক মানি থাকলে সমপরিমাণ নগদ অর্থ জমা থাকার কথা। কিন্তু নগদের বেলায় ৬৭৫ কোটি টাকার ঘাটতি আছে বলে তাঁর দাবি।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কোনো কারণে মুখ থুবড়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন গ্রাহকেরা—এমন মন্তব্য করে আর্থিক খাতের তদারকি ও নজরদারির দায়িত্ব ঠিকঠাক পালনে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি জোর দেন আইজিপি।
ব্যাংক খাতের অনিয়মের কথা তুলে তিনি বলেন, বেশি মুনাফার লোভ দেখিয়ে গ্রাহকের টাকা নেওয়ার পর ব্যাংক সংকটে পড়লে দায়টা গিয়ে পড়ে গ্রাহকের ঘাড়েই। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে নিজেরও টাকা রাখার অভিজ্ঞতা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অর্থ তোলার পর ব্যাংকটি সংকটে পড়েছে।
ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও যথাযথ তদারকির ওপর জোর দেন আইজিপি। তাঁর মতে, শুধু নিয়মকানুন বানালেই চলবে না, সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক ও গ্রাহক দুই পক্ষকেই নৈতিকতার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূলনীতি বোঝার তাগিদ দেন তিনি। পাশাপাশি ঝুঁকি ভাগাভাগি, বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই আর গ্রাহকের সক্ষমতা মাথায় রেখে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালানোর কথা বলেন।
আইজিপি বলেন, অনিয়ম ও ঋণখেলাপির কারণে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিতেও। সে জন্য বিনিয়োগের আগে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করা দরকার।
আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সবার সহযোগিতা চান তিনি। আইজিপি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকারখানা কিংবা শ্রমিকদের নানা সংকটের সময়ও পুলিশকে মাঠে থাকতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
তাঁর ভাষ্য, দায়িত্ব পালনে পুলিশকে যেমন আইন ও সংবিধান মানতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা করার অধিকার নয়; সমাজে থাকতে হলে আইন ও নৈতিকতা মেনে চলতেই হবে।
আইনশৃঙ্খলা ভালো না থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি থমকে যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাই শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে পুলিশসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলিত চেষ্টা দরকার।
গুজব ছড়ানো থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনুমান করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ নয়; তাদের কাজ আইন ও সংবিধান মেনে দায়িত্ব পালন। পুলিশের কাজের মূল্যায়ন করতে হলে প্রকৃত ঘটনা দেখতে হবে, আর বাহিনীর সদস্যরা অপরাধ করলে তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রেক্ষাপট
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ২৪ ফেব্রুয়ারি মো. আলী হোসেন ফকিরকে পদোন্নতি দিয়ে আইজিপি নিয়োগ দেওয়া হয়; তখন তিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান ছিলেন — দেশ রূপান্তর সেদিন এ তথ্য জানায়।
দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিএস (পুলিশ) ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাজনৈতিক কারণে প্রথমবার চাকরিচ্যুত এবং পরের বার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল; অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি চাকরি ফিরে পান।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: দেশ রূপান্তর, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬