সরকারি ঋণে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বে মোট ঋণ ছাড়াল ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার
ছবিঃ সংগৃহীত
সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বিশ্বের মোট ঋণ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৪ থেকে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও ওপরে পৌঁছেছে। বিশ্ব অর্থনীতির ঘাড়ে ঋণের এমন বোঝা আগে কখনো দেখা যায়নি। পৃথিবীজুড়ে এক বছরে যত পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তার মোট আর্থিক মূল্য বা বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে তুলনা করলেই সংকট কতটা গভীর, তা বোঝা যায়। এই ঋণ কেবল সরকারগুলোর আর্থিক সামর্থ্যে চাপ দিচ্ছে না; সুদ পরিশোধের বাড়তি খরচ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি আর জনসেবায় বরাদ্দের টানাটানির পথ ধরে এর আঁচ লাগছে সাধারণ মানুষের জীবনেও।
আইআইএফের সর্বশেষ হিসাবে বিশ্বের মোট জিডিপি এখন ১১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। ২০২৬ সালের জুন শেষে বৈশ্বিক ঋণ-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩১০ শতাংশে; মানে, এক বছরে বিশ্বে উৎপাদিত মোট পণ্য ও সেবার আর্থিক মূল্যের প্রায় ৩ দশমিক ১ গুণ ছিল মোট ঋণ।
জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, কম মজুরি, সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া বাড়ির দাম আর শিক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকার প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপের নানা দেশে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে কিছু বিক্ষোভ সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে গড়ালেও অনেক জায়গায় তা শান্তিপূর্ণ থেকেছে।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার সারা দেশে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে নামেন। শিক্ষা খাতের সমস্যা ও জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে শিক্ষার্থীদের কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মধ্যেই এই বিক্ষোভ হয়।
বিক্ষোভগুলো ইউরোপের দেশগুলোর বাড়তে থাকা আর্থিক সংকটকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বছরের পর বছর বিপুল ঋণ নেওয়ায় অনেক দেশ এখন ভারী ঋণের বোঝা টানছে, আর সেই ঋণের সুদের খরচও বাড়ছে। ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সবচেয়ে বেশি। সুদ পরিশোধে সরকারের খরচ যত বাড়ছে, স্কুল, হাসপাতাল, পেনশনের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে খরচের টাকা তত কমছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে সরকারগুলো কীভাবে ঋণ নেয়, সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স কোথায় এবং ঋণের সুদ পরিশোধে বিশ্বে কত খরচ হচ্ছে।
সরকার কীভাবে ঋণ নেয়
ব্যাংক থেকে সরাসরি না নিয়ে সরকার সাধারণত সরকারি বন্ড বিক্রি করে টাকা তোলে। বন্ড কেনার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা সুদ পান, আর নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মূল টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি থাকে। যেমন, ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের মূল অর্থ সরকার ফেরত দেয় ১০ বছর পর। বিনিয়োগকারী সরকারকে ধার দিয়ে কত মুনাফা পাচ্ছেন, তা বোঝায় এই বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার। একটি দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় বাজারের আস্থা কতটা, সেটি মাপারও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।
ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরোয় ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ড কিনলেন। এখন সুদের হার ২.৫ শতাংশ হলে তিনি বছরে ২.৫০ ইউরো করে ১০ বছরে মোট ২৫ ইউরো সুদ পাবেন; হার ৫ শতাংশ হলে বছরে ৫ ইউরো করে ১০ বছরে পাবেন মোট ৫০ ইউরো। দুই ক্ষেত্রেই মেয়াদ শেষে ফেরত পাবেন মূল ১০০ ইউরো।
সরকারি বন্ডের দাম পড়ে গেলে সাধারণত এর ইল্ড বাড়ে, ফলে নতুন ঋণ নিতে সরকারকে বেশি সুদ গুনতে হয়। বাড়ির ঋণের সুদ বাড়লে যেমন একটি পরিবারের মাসিক খরচ বেড়ে অন্য খাতের টাকা কমে যায়, সরকারি ঋণের সুদ বাড়লেও তেমনি জনসেবা ও অবকাঠামোয় সরকারের খরচের সামর্থ্য কমে।
ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদ ২০০০-এর দশকের শুরুর পর আর ৫ শতাংশের কাছাকাছি ওঠেনি; তখন ইউরো চালু হয়েছে সবে কিছুদিন। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি, স্পেনের মতো বিপদে থাকা দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তারও বেশি সুদে ধার নিতে হয়েছিল। সুদ ৭ শতাংশ ছাড়ানোর পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের আশ্রয় নিতে হয়।
ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদ এখন প্রায় ৫ শতাংশ, যেখানে জার্মানির ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। দুই দেশের সুদের ব্যবধান বাড়ার অর্থ, ফ্রান্সকে ধার দিতে বিনিয়োগকারীরা জার্মানির চেয়ে বেশি মুনাফা চাইছেন।
ইউরোজোনের দেশগুলো আর যুক্তরাজ্যের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদ পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, ইউরোজোনের ঋণসংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দুই দেশ ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও এখন বেশি সুদ দিচ্ছে ফ্রান্স। প্রতিবেদনে উল্লিখিত দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের চেয়ে বেশি সুদ দিচ্ছে কেবল যুক্তরাজ্য, যে দেশটি ইউরোজোনের সদস্য নয়।
কার ঋণ কত
মোট সরকারি ঋণের হিসাবে বিশ্বে সবার ওপরে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। কোনো দেশে নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত সব চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যকেই জিডিপি বলা হয়।
বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নিতে পারায় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা তোলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ। বিশ্বজুড়ে ডলারের যে চাহিদা, তা দেশটির সরকারি ঋণের চাহিদাও ধরে রাখে। তবে এই সুবিধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়ার সামর্থ্য সীমাহীন হয়ে যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীন; দেশটির সরকারি ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। জাপানের সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, আর প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ-জিডিপি অনুপাত তাদেরই—১৯৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১০২ শতাংশ। ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারি ঋণ নিয়ে ফ্রান্স বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ঋণগ্রস্ত দেশ; দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
মোট অঙ্কে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ইতালির ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। তবে অর্থনীতির আকারের তুলনায় ইতালির বোঝা ভারী; দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তাতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করার চেষ্টা আরও কঠিন হতে পারে।
শুধু সরকারি ঋণ নয়, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় বোঝা হয়ে উঠছে। আইআইএফের তথ্যে, সরকার, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বের মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মাথাপিছু হিসাবে বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের ভাগে পড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান বাজারের দেশগুলো থেকে।
গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো শুধু সরকারি বন্ডের সুদ দিতেই খরচ করেছে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অঙ্ক বিশ্বের সামরিক খাতের মোট ব্যয় (৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ (২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যয়ের (২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার) প্রতিটির চেয়েই বেশি।
সুদ পরিশোধের খরচ বাড়লে জনসেবায় বরাদ্দ কমতে পারে। ঘাটতি সামলাতে সরকারকে কর বাড়াতে কিংবা খরচ কাটতে হতে পারে, যার ধাক্কা লাগার আশঙ্কা শিক্ষা, চিকিৎসা, পেনশনসহ নানা জনকল্যাণমূলক সেবায়।
সরকারের ধার নেওয়ার খরচ বাড়লে বাড়ি কেনা, গাড়ি কেনার ঋণ আর ক্রেডিট কার্ডের সুদও বাড়তে পারে। তখন পরিবার ও ব্যক্তির ঋণ শোধের খরচ বাড়ে, অন্য জরুরি খাতে খরচের সামর্থ্য কমে।
ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে জীবনযাত্রার খরচ, কম মজুরি আর আবাসনসংকটের মতো তাৎক্ষণিক কারণ থাকলেও বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ ও সুদের খরচ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। একদিকে ঋণের চাপ সামলানো, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পেনশনসহ জনসেবার অর্থের চাহিদা মেটানো—এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখাই এখন ইউরোপের বহু সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রেক্ষাপট
স্টক অ্যানালাইসিসের ২৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (আইআইএফ) ২৩ সেপ্টেম্বর বৈশ্বিক ঋণের এই হিসাব প্রকাশ করে; টানা ছয় প্রান্তিক ধরে বিশ্বে ঋণ বাড়ছে।
সংখ্যার হিসাব
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের একই সময়ে বৈশ্বিক ঋণ বেড়েছিল ২১ ট্রিলিয়ন ডলার; এবার প্রথম ছয় মাসে বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার।
আইআইএফের হিসাবে, উদীয়মান বাজারের ঋণ এই সময়ে ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ১১০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে; এর মধ্যে চীনের ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
এক নজরে
আইআইএফ বা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স হলো বিশ্বের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সংগঠন, যা নিয়মিত বৈশ্বিক ঋণ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে; স্টক অ্যানালাইসিসের প্রতিবেদনে এই প্রতিবেদনকেই উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট সূত্র: স্টক অ্যানালাইসিস, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬