সুনাম থেকে রুমা কূপ: হজরত উসমান (রা.)-এর ব্যবসার ৬ কৌশল
ছবিঃ সংগৃহীত
ইসলামের তৃতীয় খলিফা হিসেবেই হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-কে আমরা বেশি চিনি। অথচ খিলাফতের দায়িত্ব কাঁধে আসার আগে তিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে সফল ও দূরদর্শী ব্যবসায়ীদের একজন।
তাঁর ব্যবসায়িক জীবন খুঁটিয়ে দেখলে সততা, সুনাম, ঝুঁকি সামলানো, বাজারের চাহিদা বোঝা, সম্পদের সামাজিক ব্যবহার আর নৈতিক অর্থনীতির মতো আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের ছাপ পাওয়া যায়।
আধুনিক ‘ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘ইকোনমিক থিওরি’র চোখে তাঁর জীবন পড়লে ইসলামি ব্যবসার চিরন্তন সৌন্দর্য আর কার্যকারিতা আরও পরিষ্কার হয়।
ব্যবসায় টাকা, পণ্য বা কাঁচামালই একমাত্র সম্পদ নয়। ব্যবসায়ীর সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা আর সমাজে গ্রহণযোগ্যতাও বড় পুঁজি। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো (Pierre Bourdieu) ‘সামাজিক পুঁজি’ (Social Capital) ও ‘প্রতীকী পুঁজি’ (Symbolic Capital)-র ধারণা দিয়ে দেখিয়েছেন, সামাজিক সম্পর্ক ও সম্মানও মানুষের কাজের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
হজরত উসমান (রা.)-এর ব্যবসায়িক জীবন ছিল এই আস্থারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ক্রেতা বা অংশীদারের মনে কোনো ব্যবসায়ীর প্রতি আস্থা তৈরি হলে লেনদেনে সন্দেহ, অনিশ্চয়তা আর বাড়তি যাচাইয়ের দরকার কমে যায়। এতে ব্যবসায়িক সম্পর্কও টেকে অনেক দিন।
অর্থনীতিবিদ অলিভার উইলিয়ামসনের (Oliver Williamson) ‘ট্রানজেকশন কস্ট ইকোনমিকস’ (Transaction Cost Economics) বলে, একটি লেনদেন শেষ করতে তথ্য জোগাড়, যাচাই, দর-কষাকষি আর চুক্তি বাস্তবায়নে যে খরচ হয়, সেটিই ‘লেনদেন ব্যয়’। ব্যবসায়ীর খাঁটি সুনাম এই খরচ অনেকখানি কমিয়ে দেয়। তার মানে, সততা কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, আধুনিক ব্যবসা সচল রাখারও বড় শর্ত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা ভিন্ন।’ (সুরা নিসা: ২৯)
আধুনিক ‘বিজনেস এথিকস’-এর সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ধারণার সঙ্গে এসব নীতির গভীর মিল আছে। তাই ব্যবসার সাফল্য মাপা উচিত শুধু মুনাফার অঙ্কে নয়, মুনাফা কীভাবে এল, সেই পদ্ধতি দিয়েও।
ব্যবসার একটি সোনালি নিয়ম হলো সব পুঁজি এক জায়গায় না রেখে নানা খাতে ছড়িয়ে রাখা, যাতে এক খাতের লোকসান আরেক খাতের লাভে পুষিয়ে যায়। কুরাইশদের বাণিজ্যে এই ধারণার স্পষ্ট ছাপ ছিল। তাদের শীত ও গ্রীষ্মের বাণিজ্যযাত্রার কথা পবিত্র কোরআনে এসেছে এভাবে:
‘কুরাইশের অভ্যস্ততার কারণে; তাদের অভ্যস্ততার কারণে শীত ও গ্রীষ্মের সফরে।’ (সুরা কুরাইশ: ১-২)
শীতে ইয়েমেন আর গ্রীষ্মে শাম (সিরিয়া) অঞ্চলে বাণিজ্য করে তারা কোনো একটি বাজার বা পথের ওপর নির্ভরতা কমাত। আধুনিক অর্থনীতিতে হ্যারি মার্কোউইৎজের ‘পোর্টফোলিও ডাইভারসিফিকেশন’ (Portfolio Diversification) তত্ত্বের মূল কথাও এটিই।
কুরাইশের সফল ও দূরদর্শী ব্যবসায়ীদের অন্যতম ছিলেন হজরত উসমান (রা.)। শামসহ নানা অঞ্চলের বাজারে ছড়িয়ে ছিল তাঁর বাণিজ্য। এই বৈচিত্র্যময় বিস্তারই প্রতিকূল সময়েও তাঁর সম্পদ নিরাপদ রেখেছিল।
ইসলামি অর্থব্যবস্থায় ‘মুদারাবা’ এমন এক অংশীদারি চুক্তি, যেখানে এক পক্ষ পুঁজি খাটায় আর অন্য পক্ষ দেয় শ্রম ও দক্ষতা। লাভ ভাগ হয় আগে ঠিক করা অনুপাতে। লোকসান হলে পুঁজিদাতা হারান টাকা, আর পরিচালক হারান তাঁর শ্রম।
এ ব্যবস্থার ভিত্তি আমানতদারি আর পারস্পরিক সম্মতি। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি দুই অংশীদারের তৃতীয়জন, যতক্ষণ না তাদের একজন অন্যজনের সঙ্গে খিয়ানত করে।’ (সুনানে আবু দাউদ)
চাহিদা, জোগান ও মূল্যসংকেত
বাজারে কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়লে আর জোগান একই থাকলে সাধারণত দাম বাড়ে। আবার জোগান বাড়লে দাম কমার দিকে যায়। চাহিদা আর জোগানের এই সম্পর্কই বাজারদর ঠিক করতে বড় ভূমিকা রাখে। বাজারদরের ওঠানামা আর বিভিন্ন বাজারের দামের ফারাক কাজে লাগিয়ে পণ্য কেনাবেচার প্রক্রিয়াকে বলে ‘Arbitrage’।
মদিনায় যখন ভয়াবহ খাদ্যসংকট, তখন সেখানে এসে পৌঁছায় হজরত উসমান (রা.)-এর খাদ্যবোঝাই বিশাল এক বাণিজ্য-কাফেলা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চড়া দামে সেই খাদ্য কিনতে চান, বাড়তি দামের প্রস্তাবও দেন। কিন্তু তিনি বিক্রি না করে সব খাদ্য আল্লাহর ওয়াস্তে অভাবী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অর্থনীতির দিক থেকে ঘটনাটির তাৎপর্য হলো, বাজারে চাহিদা আর দাম বেশি থাকলেই সর্বোচ্চ মুনাফাকে একমাত্র লক্ষ্য বানাতে হবে, এমন নয়। ব্যবসায়ীর নৈতিকতা, সামাজিক দায় আর মানুষের জরুরি প্রয়োজনও তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলাম বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমের গুরুত্ব মেনে নেয়। পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের দুর্দশা পুঁজি করে অন্যায় মুনাফার কঠোর নিন্দাও করে।
সুরা মুতাফফিফিনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়; যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, কিন্তু তাদের মেপে দেওয়ার বা ওজন করে দেওয়ার সময় কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন: ১-৩)
ব্যবসায় প্রতারণা আর অন্যের হক মেরে খাওয়ার বিরুদ্ধে এই আয়াত সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। ইসলামে ন্যায্য লেনদেন মানে কেবল সঠিক মাপ-ওজন নয়; এর ভেতরে আছে সততা, ন্যায়বিচার, লোভ থেকে দূরে থাকা আর মানুষের প্রয়োজনের প্রতি সহমর্মিতা।
মদিনার দুর্ভিক্ষের সময় হজরত উসমান (রা.) সিরিয়া থেকে প্রচুর খাদ্যশস্য নিয়ে এলে স্থানীয় বণিকেরা তাঁকে ১০-এর বিনিময়ে ১২, পরে ১৫ গুণ দাম দিতে চান। কিন্তু উচ্চ মুনাফার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে পুরো খাদ্যশস্য তিনি দরিদ্র ও অভাবী মানুষের মধ্যে সদকা হিসেবে বিলিয়ে দেন।
কোনো বাজারে যখন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি মিলে পণ্যের দাম অতিরিক্ত হাঁকায়, তখন বিকল্প না থাকায় সাধারণ ক্রেতাকে তা মেনে নিতে হয়। ঠিক সেখানে নতুন কোনো উদ্যোক্তা বা প্রতিযোগী কম দামে বা জনকল্যাণমূলক প্রস্তাব নিয়ে ঢুকলে খুব দ্রুত বাজারের চেহারা বদলে যায়।
একই কৌশলগত বুদ্ধির দেখা মেলে হজরত উসমান (রা.)-এর রুমা কূপ কেনার ঐতিহাসিক ঘটনায়। মদিনার একমাত্র সুপেয় পানির কূপের একচেটিয়া ব্যবসা ভাঙতে তিনি যুদ্ধ বা বিবাদে যাননি, বাজারের কৌশলেই জয় করেছেন। কূপটির আংশিক মালিকানা কিনে নিজের পালার দিনে মানুষকে বিনা মূল্যে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। এতে প্রতিপক্ষের চড়া দামের ব্যবসা অচল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি পুরো কূপটিই ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
আধুনিক ব্যবসার ভাষায় একে বলা যায় ‘একচেটিয়া বাজার ভাঙা’ (Breaking Market Monopoly), ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি’ এবং ‘গ্রাহকের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রসার’।
সব মিলিয়ে, প্রাথমিক যুগের ইসলামি সমাজে ব্যবসা, নৈতিকতা আর সামাজিক দায়ের সম্পর্ক বুঝতে হজরত উসমান (রা.)-এর ব্যবসায়িক জীবন এক উজ্জ্বল দলিল। তাঁর সুনাম, সততা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আর জনকল্যাণমুখী কৌশল আজকের ব্যবসায়িক জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের সার্বিক উন্নয়নেও আলোর পথ দেখাতে পারে।
লেখক: মুহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এক নজরে
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরে রুমা কূপটি মদিনার আকিক উপত্যকায়, মসজিদে কিবলাতাইন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে, এখনো সচল আছে; কূপটি সৌদি আরবের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং এর পানি খেজুরবাগানের সেচে ব্যবহৃত হয়।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: প্রথম আলো, ৪ মে ২০২৫ (হালনাগাদ)