হরমুজ খোলার ইরানি প্রস্তাবে সাড়া দিতে তাড়া নেই ট্রাম্পের
ছবিঃ সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবে এখনই সাড়া দিতে কোনো তাড়া বোধ করছেন না। ইরানের প্রস্তাবটি হলো সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়া।
তেহরানের এ প্রস্তাবের ব্যাপারে এই মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না ওয়াশিংটন—আল-জাজিরাকে এমনটাই জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, তেল ও জ্বালানির দাম কমে আসা ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বটে; তবে ইরানের প্রস্তাব মেনে নিতে তিনি যে কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না, সেটিও পাশাপাশি দেখাতে চান।
আল-জাজিরার সঙ্গে আলাপে কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্যই চাইবেন তেল ও পেট্রলের দাম কমুক। তবে একই সঙ্গে তিনি বোঝাতে চান, এ ব্যাপারে তিনি তাড়াহুড়ো করছেন না।”
মাসগ্রেভ মনে করেন, যুদ্ধের চলমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব সুবিধা এনে দিয়েছে, তা খোয়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে—এ রকম কোনো শর্ত মেনে যুদ্ধের ইতি টানতে চাইবেন না ট্রাম্প। অর্থাৎ সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে যে সুবিধাগুলো অর্জিত হয়েছে, আলোচনার টেবিলে সেগুলো যেন হারাতে না হয়—ইরানের সঙ্গে সমঝোতার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন তেমন অবস্থানই বজায় রাখতে চায়।
ইরান সম্প্রতি জানায়, সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে; তবে সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক চাপ কমাতে হবে এবং ইরানের ওপর আরোপ করা অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। এই প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ, যেখান দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি বিপুল পরিমাণে আনা-নেওয়া হয়। সে কারণে দীর্ঘ সময় পথটি বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় রকমের অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা আছে।
অবশ্য ইরানের প্রস্তাবটি শুধুই অর্থনৈতিক চাপের পরিণতি—ওয়াশিংটন বিষয়টিকে সেভাবে দেখছে না। মাসগ্রেভের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ কোন পথে গড়াবে, তা ঠিক করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, ইসরায়েলে এখন যে জোট ক্ষমতায় আছে, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এ কারণে দেশটিতে যুদ্ধ তাড়াতাড়ি থামানোর বদলে তা অব্যাহত রাখার চাপটাই বেশি। তার মতে, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি স্থগিত রাখা এবং লেবানন থেকে সরে না আসার প্রশ্নেও ইসরায়েলি রাজনীতিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
মাসগ্রেভের ভাষায়, “মানুষ যদি মনে করে অর্থনৈতিক চাপের কারণেই ইরান আসলে সমঝোতার চেষ্টা করছে, তাহলে ওয়াশিংটনের কাছে এর মানে দাঁড়াতে পারে—চাপ কমানো নয়, বরং এখনই আরও জোরালোভাবে চাপ দেওয়ার সময়।”
এর অর্থ দাঁড়ায়, হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট এবং ইরানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ট্রাম্প প্রশাসনের চোখে একদিকে যেমন আলোচনার সুযোগ, অন্যদিকে তেমনি তেহরানের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধির কারণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকার প্রভাব গিয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে একদিকে তেল ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, অন্যদিকে বেড়ে যেতে পারে পরিবহন খরচ; আর এর আঘাত এসে পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর।
এ অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসন দুটি লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে চাইছে—জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা এবং ইরানের কাছ থেকে বাড়তি ছাড় আদায় করা। সে কারণে ইরানের দেওয়া সাত দিনের প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াশিংটন এরপর কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি চলমান যুদ্ধের গতিপথ এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা