ছবিঃ সংগৃহীত
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি দখলের অভিযোগ তুলে ভারতের আসাম রাজ্যের নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপে গত রোববার ছয় শতাধিক মুসলিম পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে রাজ্য সরকার। বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা রাজ্যটিতে এর ঠিক আগের দিন আরও তিন জেলায় পাঁচ শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। সব মিলিয়ে দুই দিনে উচ্ছেদ হয়েছে ১ হাজার ১০০টির বেশি মুসলিম পরিবার।
এসব তথ্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রলকে দিয়েছেন আসাম বন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। প্রশাসনের দাবি, পরিবারগুলো বনভূমি দখল করে বসবাস করছিল। রোববার ছিল উচ্ছেদ অভিযানের দ্বিতীয় দিন।
রাজ্য সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্ক্রলকে জানিয়েছেন, তার আগের দিন শনিবার কড়া নিরাপত্তার মধ্যে নগাঁও, গোলাঘাট ও হোজাই জেলায় অভিযান চালিয়ে মোট ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়—নগাঁওয়ে ৩৩৬টি, গোলাঘাটে ৫৯টি এবং হোজাইয়ে ১৫২টি। উচ্ছেদ হওয়া মানুষের বড় অংশই বাংলাভাষী মুসলিম।
লুতুমারির পরিবারগুলো কয়েক দশক ধরে সংরক্ষিত বনের ৩০০ হেক্টরের বেশি জমিতে বাস করছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, তাঁরা অবৈধ দখলদার নন; সরকারই তাঁদের সেখানে পুনর্বাসন করেছিল।
রোববার নিজের ঘর ভাঙা পড়ার পর লুতুমারির বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী আবদুন নূর বলেন, ‘১৯৭৪ সালে সরকার আমাদের এখানে পুনর্বাসিত করেছিল। আমরা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা। আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভূমিহীন ছিলেন বলে সরকার আমাদের এখানে বসতি গড়ে দিয়েছিল। সব মিলিয়ে ৩০০টি ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি দেওয়া হয়েছিল।’
উচ্ছেদ ঠেকাতে তাঁরা গুয়াহাটি হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন বলেও জানান আবদুন নূর—‘আমরা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে গুয়াহাটি হাইকোর্টে মামলা করেছিলাম, কিন্তু আদালত আমাদের কোনো প্রতিকার দেননি।’ তাঁর দাবি, অভিযানে ১০টির বেশি মসজিদও ভেঙে ফেলা হয়েছে, যার কয়েকটির বয়স ৫০ বছর পেরিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বন বিভাগে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতাম। এ কারণেই অনেককে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল।’
লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গ্রামবাসীদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা বাদ দিতে গত জুনে আসাম সরকারকে আহ্বান জানিয়েছিল অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস। সংগঠনটির যুক্তি ছিল, ওই এলাকার চারটি গ্রামের মানুষকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ‘টংগিয়া’ বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় সেখানে বসানো হয়েছিল; তাই তাঁদের সাধারণ বনভূমি দখলকারীর কাতারে ফেলা ঠিক নয়।
টংগিয়া পদ্ধতিতে বনে বসবাসকারী মানুষ বন বিভাগের অধীনে কাজ করতেন এবং বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান গাছের পাশাপাশি খাদ্যশস্যও ফলাতেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশরা পদ্ধতিটি চালু করে, পরে আসামের কিছু এলাকাতেও এর প্রয়োগ হয়।
বনাঞ্চলের ওই চার গ্রাম হলো কন্দর্প লংজাপ, পদুমনি, হাতিজুর ও ৯ নম্বর খেরোনি। স্ক্রলের সংকলিত হিসাব বলছে, আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) গত ১০ বছরের শাসনে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই মুসলিম। রাজ্যের রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য থেকে এই হিসাব করা হয়েছে।
প্রেক্ষাপট
এর আগেও লুতুমারিতে বড় উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। নর্থইস্ট নাউ ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর জানায়, নগাঁও জেলার লুতিমারি সংরক্ষিত বনের প্রায় ৭৯৫ হেক্টর জমি খালি করতে চালানো অভিযানে প্রায় দেড় হাজার পরিবার উচ্ছেদ হয়।
প্রেক্ষাপট সূত্র: নর্থইস্ট নাউ, ১ ডিসেম্বর ২০২৫