সুন্দরবনের নদী-খালে নতুন পাওয়া ৫ মাছ ও ২ চিংড়ির ডিএনএ যাচ্ছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে
ছবিঃ সংগৃহীত
সুন্দরবনের পানিতে নতুন করে খুঁজে পাওয়া পাঁচ প্রজাতির মাছ আর দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স জায়গা পেতে চলেছে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে ঘিরে দেশের পরিবেশ ও মৎস্যবিজ্ঞানে একে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে; এটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য গবেষণায় অনন্য উদ্ভাবন ও নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
আগামী নভেম্বরে ঢাকায় একটি কর্মশালা হওয়ার কথা, যেখানে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে গবেষক দল তাদের ফলাফল বন বিভাগের হাতে তুলে দেবে। এরপরই জিন ব্যাংকে যুক্ত হওয়ার সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
এই সাফল্য এসেছে ‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শিরোনামের ১৬ মাসের এক বিস্তৃত গবেষণায়। বাংলাদেশ সরকারের ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প’-এর আওতায় যৌথভাবে গবেষণাটি করেছে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন। সম্প্রতি খুলনার এক অনুষ্ঠানে গবেষণার খসড়া তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন—এই ১৬ মাসে গবেষকেরা সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি নদী ও খালে জরিপ চালান। বনের ভেতরে ৪২৪ কিলোমিটার এলাকায় নৌকায় ঘুরে এবং শ্যামনগর, কয়রা, মোংলা ও শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক জানান, গবেষণা শেষে তাঁরা পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির তথ্য আমেরিকার আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে আপলোডের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি বন বিভাগের হওয়ায় নভেম্বরে ঢাকায় প্রকল্পের চূড়ান্ত কর্মশালায় বন ও পরিবেশ মন্ত্রীর উপস্থিতিতে ফলাফল বন বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। পরে সরকারিভাবে বন বিভাগের মাধ্যমেই এই সাত প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে যুক্ত হবে।
তিনি আরও জানান, এর আগে সুন্দরবনের ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হয়েছে। সেই গবেষণা করেছিল শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল, কোরিয়ার সহযোগিতায় ও বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে। উপযুক্ত পরিবেশ আর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের এই জলজ সম্পদ আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গবেষক দলটি সুন্দরবনের ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর ডিএনএ বারকোড তৈরি করেছে। এর অংশ হিসেবে মাছের ৮৩টি নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য সম্পূর্ণ নতুন পাঁচটি মাছ ও দুটি চিংড়ির প্রজাতি নথিভুক্ত করা হয়, যেগুলোর ডিএনএ সিকোয়েন্স বিশ্বের কোনো আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে আগে ছিল না।
এসব তথ্য আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে ঢুকলে বিশ্বের কাছে সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হবে, আর বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এসব প্রজাতি নিয়ে আরও নিখুঁত গবেষণা করতে পারবেন।
নতুন পাওয়া মাছগুলো হলো বড় আইশ পারশে, ফোটা বাটা, বার্মিজ এক ঠুইটা, কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে এবং সবুজ ফোঁটা বেলে। এর সঙ্গে মিলেছে সম্পূর্ণ নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ি—মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি পোকা।
সুন্দরবনের চার রেঞ্জ—শরণখোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও চাঁদপাই—জুড়ে জলজ সম্পদের অবস্থা, প্রজনন মৌসুম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে গবেষণায়।
গবেষণার ফল বলছে, প্রজাতির বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি শরণখোলা রেঞ্জে—১৬৪টি। তবে অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং নদী-খালে বিষ দেওয়ার মতো অবৈধ কাজের কারণে বেশ কিছু প্রজাতির প্রাকৃতিক মজুত হুমকিতে পড়ছে।
নতুন এই গবেষণায় সুন্দরবনে মোট ২৫১ প্রজাতির মাছ ও ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। আগের গবেষণাগুলোর ফল মিলিয়ে সুন্দরবনে এখন পর্যন্ত মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ এবং ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত প্রাণীর (চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস ও স্কুইড) সন্ধান পাওয়া গেল।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রজাতিগুলো শনাক্ত হয়েছে মরফো-মলিকুলার পদ্ধতিতে মাইটোকন্ড্রিয়াল (কোনো জীবের প্রজাতি নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের একটি আধুনিক ও সমন্বিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি) পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ পদ্ধতিতে মরফোলজিক্যাল (বাহ্যিক গঠনগত) ও মলিকুলার (ডিএনএ বা জিনগত)—দুটি পদ্ধতি একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে কোনো জীবের নিখুঁত ট্যাক্সোনমিক শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। এভাবে মোট ৮৩টি মাছ ও ২৮টি ক্রাস্টাশিয়ান নমুনা শনাক্ত করে ৩০ প্রজাতির মাছ ও ১১ প্রজাতির ক্রাস্টাশিয়ানস (খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী) মিলিয়ে মোট ৪১টি প্রজাতির বারকোড সিকোয়েন্স তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের রেফারেন্সের সঙ্গে এসব সিকোয়েন্সের নিউক্লিওটাইডের (ডিএনএ ও আরএনএ নামের নিউক্লিক অ্যাসিডের মৌলিক গাঠনিক একক বা মনোমার) মিল পাওয়া গেছে ৯৮.১৯% থেকে ১০০% পর্যন্ত।
গবেষকদের ভাষ্য, এর মধ্য দিয়ে সুন্দরবন অঞ্চলের জলজ প্রাণীর জিনোম ডেটাবেজ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্ত হতে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে প্রজাতি সুরক্ষা, অবৈধ শিকার ঠেকানো ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত আহরণ, পোনা মাছ ধরা এবং ক্ষতিকর বিষ প্রয়োগের কারণে ভেটকি, পোয়া, পাঙাশের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় মাছ উদ্বেগজনক হারে কমছে। সুন্দরবনের এই জলজ ভান্ডার টিকিয়ে রাখতে প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশের মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির আহরণসীমা ঠিক করা ও নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা; বিষ প্রয়োগ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা; প্রজনন নিশ্চিত করতে বাস্তুসংস্থানগতভাবে উপযুক্ত নতুন খাল (যেমন খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগা খাল) ‘সংরক্ষিত খাল’ ঘোষণা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা।
সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বাসসকে বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নতুন অর্জন সুন্দরবনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। গবেষণার সুপারিশ মেনে সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, সুন্দরবনের মাছের প্রজাতি শনাক্ত এবং জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন।
২০২০ ও ২০২১ সালের দিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা সুন্দরবনের জলজ প্রাণী নিয়ে একটি বড় গবেষণা করেন। মাছের প্রজাতি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে তাঁরা ডিএনএ বারকোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন; বারকোডিং করা হয় সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুকের।
সেই গবেষণার অংশ হিসেবে সুন্দরবনের লোনা ও আধা-লোনা পানির প্রায় ১২০টি জেনেরা ও ৬৫টি জলজ প্রাণীর (যার বেশির ভাগই মাছ) মোট ১৮৫টি মাইটোকন্ড্রিয়াল সিকোয়েন্স ও ৫৯টি আরএনএ সিকোয়েন্সের তথ্য আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছিল।
সূত্র — মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা |