ছবিঃ সংগৃহীত
এড শিরানের উত্তর আমেরিকা সফর থেকে বাদ পড়ার পর প্রথম কনসার্টেই আবার ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ (ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো) স্লোগান তুললেন ম্যাকলমোর। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার কলোরাডোর রেড রকস অ্যাম্ফিথিয়েটারে ১৭টি গান গেয়েছেন এই মার্কিন র্যাপার। সেপ্টেম্বরে শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর এটাই ছিল তাঁর প্রথম মঞ্চে ওঠা।
দর্শকদের উদ্দেশে ম্যাকলমোর বলেন, এই সময়ে মানুষ হিসেবে টিকে থাকা খুব জটিল কিছু নয়, রাজনীতির বিষয়ও নয়। হৃদয় থাকা, অন্যের কষ্ট দেখে তা অনুভব করা এবং বলা ‘আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে!’—মানবিকতা বলতে এটুকুই। এরপর তিনি দুবার বলেন, ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো; বলেন সুদানকে মুক্ত করার কথা। কঙ্গো, লেবানন, হাইতি—সব জায়গার মুক্তির ডাক দেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে যাঁরা আইসিই-এর ভয়ে ঘর থেকে বের হতেও আতঙ্কে থাকেন, তাঁদের কথাও তোলেন।
বক্তব্য শেষ করেন এই বলে যে তাঁদের বার্তা সব সময় একটাই—ভালোবাসা। এনএমই জানিয়েছে, তাঁর এ কথার পর দর্শকেরা হাততালি আর উল্লাসে সমর্থন জানান। ‘দ্য মেরি সু’র তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের প্রসঙ্গ তোলার সময় দর্শকদের সাড়া ছিল সবচেয়ে জোরালো।
ঘটনার শুরু ৪ সেপ্টেম্বর। সেদিন নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরানের কনসার্টে নিজের ২০২৪ সালের গান ‘হিন্ডস হল’ গাওয়ার আগে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেন ম্যাকলমোর। পরের রাতেও একই আহ্বান জানান। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর সফরটির মার্কিন আয়োজক ‘মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ’ ঘোষণা দেয়, ম্যাকলমোর আর কোনো কনসার্টে থাকছেন না। আয়োজকদের ভাষ্য, বেশ কয়েকটি ভেন্যু কর্তৃপক্ষ তাঁকে পারফর্মার হিসেবে রাখতে রাজি হয়নি।
ম্যাকলমোরের দাবি, ম্যাসাচুসেটসের জিলেট স্টেডিয়ামের মালিক নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফটের কোম্পানি, আর ক্রাফটই শিরানকে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। ক্রাফট নিজেও নিশ্চিত করেছেন, জিলেট স্টেডিয়ামে ম্যাকলমোরকে পারফর্ম করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর। কারণ হিসেবে তিনি ম্যাকলমোরের ‘সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড’ এবং ‘ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য ও চিত্রকল্প ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস’-এর কথা বলেছেন।
ক্রাফটের বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ অস্বীকার করা বা তাঁদের পক্ষে কথা বলার অধিকার খর্ব করা এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য নয়। ম্যাকলমোরের সঙ্গে বসে কথা বলার সুযোগ পেলে তিনি তা স্বাগত জানাবেন বলেও যোগ করেন।
ইনস্টাগ্রামে ম্যাকলমোর লিখেছেন, এডের কাছ থেকে তাঁর ১০টি শোয়ের দরকার ছিল না, দরকার ছিল দুটি সুযোগ—৯০ হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে এমন কিছু কথা বলার, যা কোনো এক কারণে এখন উচ্চারণ করাই ভীষণ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
শিরান জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি তাঁর নেওয়া নয়। ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, সফরের জন্য ম্যাকলমোরের চুক্তি হয়েছিল আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, তাঁর সঙ্গে নয়। তাঁর ভাষ্য, ম্যাকলমোর তালিকায় থাকলে শো বাতিল করবে বলে ভেন্যুগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
শিরান বলেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সংঘাত দেখে তিনি মর্মাহত। পাশাপাশি ম্যাকলমোরের দৃঢ়তার প্রশংসা করে বলেন, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে জোর গলায় দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি তাঁর আছে। পরদিন সফরের অন্য সহযোগী শিল্পী ফিনিয়াস, লুকাস গ্রাহাম ও অ্যারন রো ম্যাকলমোরের প্রতি সংহতি জানিয়ে সফর ছেড়ে দেন।
শিরানের নিজের ব্যান্ড ‘বিওগা’-ও সেই পথ ধরে। ১৯ সেপ্টেম্বর ফিলাডেলফিয়ার অনুষ্ঠানে শিরান দর্শকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভুল করেছিলেন বলে স্বীকার করেন। ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর জিলেট স্টেডিয়ামে তাঁর যে দুটি শো হওয়ার কথা ছিল, পরে ঝড়ের কারণে সেগুলো বাতিল হয়।
‘লুপ ট্যুর’ থেকে পাওয়া নিজের ১০ লাখ ডলার ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় কাজ করা ছয়টি সংস্থাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন ম্যাকলমোর, আর ক্রাফটকেও সমপরিমাণ অর্থ দান করার আহ্বান জানান। পরে ক্রাফট ২০ লাখ ডলার (৭৩ লাখ দিরহাম) অনুদানের ঘোষণা দেন, তবে অর্থ কারা পাবে তা জানাননি। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর নিজের ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন ট্যুর’ ঘোষণা করেন ম্যাকলমোর।
এ সফরের আয় যাবে ফিলিস্তিনিদের সহায়তাকারী বিভিন্ন সংস্থার কাছে। ২৬ অক্টোবর ডাবলিনের ‘থ্রি এরিনা’য় সফরের শুরু; এরপর ২৯ অক্টোবর প্যারিস এবং ৩০ অক্টোবর লন্ডনের ‘ওয়েম্বলি এরিনা’। ‘হ্যাপি ম্যাগ’ বলছে, তিন অনুষ্ঠানের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।
ম্যাকলমোর জানান, ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি দেখাতে নিজেদের মঞ্চ ব্যবহারের সাহস দেখিয়েছেন—এমন অনেক শিল্পীর সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রেও কিছু অনুষ্ঠান হতে পারে, তবে কোনো তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এক নজরে
দ্য নিউ আরবের ২০২৪ সালের ৭ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘হিন্ডস হল’ গানটি ছয় বছরের ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবকে উৎসর্গ করে লেখা, যে গাজা সিটিতে পরিবারের গাড়িতে আটকে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি সেনাদের হাতে নিহত হয়।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভকারীরা হ্যামিল্টন হলের নাম বদলে ‘হিন্ডস হল’ রেখেছিলেন — গানের নাম সেখান থেকেই।
গানটি প্রকাশের দিনই, ২০২৪ সালের ৬ মে, এর আয় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ম্যাকলমোর — এমএক্সডিডব্লিউএন সেদিন এ খবর প্রকাশ করে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রেক্ষাপট সূত্র: দ্য নিউ আরব, ৭ মে ২০২৪; এমএক্সডিডব্লিউএন, ৬ মে ২০২৪