পাঁচ বছরে সব বিষয়ের শিক্ষার্থীকে ইন্টার্নশিপে আনতে চায় ইউজিসি
ছবিঃ সংগৃহীত
উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থান আর সামনের পথ—এসব নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আজকের পত্রিকার শিক্ষা ও ক্যারিয়ার বিভাগের ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক খান।
মামুন আহমেদ: দেশের উচ্চশিক্ষার সমস্যা, চ্যালেঞ্জ আর সম্ভাবনা সম্পর্কে আমাদের মোটামুটি ধারণা আছে। এখন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ১৮০টি—বেসরকারি প্রায় ১১৭টি, পাবলিক ৬১টি, বাকি ২টি আন্তর্জাতিক। গত ২০-৩০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় আর শিক্ষার্থী দুটোই অনেক বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজের উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ আছে। কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্নটা রয়েই গেছে। সমাজে একটা ধারণা চালু আছে যে সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান সেভাবে নিশ্চিত হচ্ছে না।
কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। চার-পাঁচ বছর পড়ে বের হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে নিজেদের পড়াশোনার তেমন মিল খুঁজে পান না। কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলেও শিক্ষার সঙ্গে সেই উদ্যোগের যোগ মেলে না। ইন্ডাস্ট্রি আর একাডেমিয়ার সম্পর্কও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তাই আমাদের সামনে বড় কাজ দুটি—মান নিশ্চিত করা, আর শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্র ও জীবনের সংযোগ তৈরি করা।
দায়িত্ব নিয়ে আমরা একটি জাতীয় কর্মশালা করেছি। সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নীতিনির্ধারক, ইন্ডাস্ট্রি ও সুশীল সমাজের নেতারা ছিলেন। তাঁদের মতামত নিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য উচ্চশিক্ষা রূপান্তরের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছি, যা শিগগির বাস্তবায়ন শুরু হবে। এর মূল স্তম্ভ শিক্ষার মান বাড়ানো, ইন্টার্নশিপসহ কর্মমুখী কর্মসূচি চালু, উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ তৈরি এবং সরকারের অগ্রাধিকার মেনে তৃতীয় ভাষা চালু। নৈতিক শিক্ষা, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সফট স্কিলও এর অংশ।
মামুন আহমেদ: ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ছিল জ্ঞান তৈরি, ছড়িয়ে দেওয়া আর সংরক্ষণ। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বিবেচনা—অর্জিত জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থী কতটা দক্ষ হলো, আর সেই দক্ষতা দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে কতটা কাজে লাগল। মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিজ্ঞান আর দক্ষতা উন্নয়ন—সব একসঙ্গে নিয়েই আমরা শিক্ষার প্রয়োজনীয় রূপান্তর চাই।
মামুন আহমেদ: এক অর্থে আমরা সফল। ৩০ বছর আগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৬-৭টি, এখন ৬১টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও বেড়েছে। ফলে আগে যাঁরা পড়তে বিদেশে যেতেন, তাঁদের অনেকেই এখন দেশেই পড়ছেন। মানসম্মত শিক্ষার খোঁজে কিছু শিক্ষার্থী যে এখনো বিদেশে যান, তাতে সন্দেহ নেই। দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এ সংখ্যা ধীরে ধীরে কমবে। সরকার ও ইউজিসি সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। এরই অংশ হিসেবে মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে একটি এডুকেশন হাব গড়তে চাই, যেখানে দেশের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বিদেশি শিক্ষার্থীরাও পড়তে পারবেন।
মামুন আহমেদ: বিষয়টি খুবই আশাজাগানিয়া। মাত্র ২৫-৩০ বছরে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই সাফল্য দেখিয়েছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, এআইইউবিসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে আছে। তাদের অভিনন্দন জানাই। এ ধারা ধরে রাখতে হবে।
মামুন আহমেদ: যারা ভালো করছে, তাদের থামলে চলবে না। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য গবেষণার উন্নত পরিবেশ দরকার, যাতে সবাই গবেষণায় যুক্ত হতে পারেন। তাহলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে তারা আরও এগোবে। যাদের সীমাবদ্ধতা আছে, তারা সেগুলো কাটিয়ে র্যাঙ্কিংয়ে ভালো করার চেষ্টা করুক—এটাই চাই।
মামুন আহমেদ: গবেষণায় ইউজিসি পাবলিক-প্রাইভেট ভেদাভেদ না করে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে উৎসাহ দেয়। আমাদের গবেষণা অর্থায়ন প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে হয়। মানসম্মত প্রস্তাব যারা দেবে, যথাযথ যাচাই শেষে তারাই অনুদান পাবে। স্বর্ণপদক বা ইউজিসি অ্যাওয়ার্ডের মতো পুরস্কারেও একই নিয়ম মানা হয়।
মামুন আহমেদ: এটা সত্যিই আমাদের উচ্চশিক্ষার বড় সংকটগুলোর একটি। সমাধানের পথ হলো কোর্স কারিকুলাম ও সিলেবাস হালনাগাদ করা, এবং কাজটি চাকরির বাজারের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে করা। তাহলে কিছুটা উন্নতি হবে। তবে শুধু চাকরির বাজারের জন্য গ্র্যাজুয়েট তৈরি করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র লক্ষ্য নয়। জ্ঞান অর্জন, গবেষণার মধ্য দিয়ে জ্ঞান সৃষ্টি ও সংরক্ষণ এবং বাজারের উপযোগী দক্ষতা—সব মিলিয়েই আধুনিক শিক্ষা। পাবলিক-প্রাইভেট নির্বিশেষে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা সেভাবেই গড়ে তুলছি।
মামুন আহমেদ: সিলেবাস ও কারিকুলামের আধুনিকায়ন আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষার্থীকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে, গবেষণায় নতুন জ্ঞান তৈরি করতে হবে, আর আধুনিক দক্ষতা নিয়ে বের হতে হবে, যাতে দেশে-বিদেশে কাজ পায়। এ জন্যই বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখার ব্যবস্থা করছি। ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র বসানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, শিগগির সেগুলোর উদ্বোধন হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেসমেন্ট সেন্টার, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ইনোভেশন সেন্টার আর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার করে দিতে চাই, যাতে শিক্ষার্থীরা দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পান এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়।
ইন্ডাস্ট্রি আর একাডেমিয়াকে জুড়তে ইন্টার্নশিপ চালুর প্রস্তুতি চলছে। এখন কৃষি ও মেডিকেলের গ্র্যাজুয়েটরা ইন্টার্নশিপ পান। আগামী পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব বিষয়ের শিক্ষার্থীকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে।
মামুন আহমেদ: এআই এখন বাস্তবতা। এর ভালো দিকগুলো নিতে চাই, খারাপ দিকগুলো বাদ দিতে চাই। একাডেমিক চর্চায় এর ভালো দিক কীভাবে রাখা যায়, সে জন্য ইউজিসি একটি এআই পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছে। সেটা মেনে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের এআই নীতিমালা করবে এবং কোথায় এআই চলবে আর কোথায় চলবে না, তা নির্দিষ্ট করে দেবে। এআইকে আমরা বাস্তবতা ও সুযোগ হিসেবেই দেখছি।
মামুন আহমেদ: ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষকের ঘাটতি আছে—এটা বাস্তবতা। চাইলেই আজ ডেকে কাল ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না, এতে সময় লাগবে। শিক্ষকদের জন্য পিএইচডি, পোস্টডক ও মাস্টার্স প্রোগ্রাম বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছি। কর্মক্ষেত্রে যাতে তাঁরা আরও ভালো করেন, সে জন্য নানা প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
মামুন আহমেদ: পাবলিক হোক বা প্রাইভেট, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করবে—এটাই আমাদের চাওয়া। সেই শিক্ষা হবে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আন্তর্জাতিক মানের। গ্র্যাজুয়েটরা মানসম্পন্ন শিক্ষা, উঁচু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ নিয়ে বের হবেন—এমন পরিবেশ আর এমন বিশ্ববিদ্যালয়ই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।
প্রেক্ষাপট
বাসসের ১৭ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আইন, ১৯৭৩’-এর ধারা ৪ (১) (এ) অনুযায়ী অধ্যাপক মামুন আহমেদকে চার বছরের জন্য ইউজিসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
খবর সংযোগের ১৬ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন সকালে ব্যক্তিগত ও শারীরিক কারণ দেখিয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ; কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নতুন চেয়ারম্যানের নাম জানান শিক্ষামন্ত্রী।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: বাসস, ১৭ মার্চ ২০২৬; খবর সংযোগ, ১৬ মার্চ ২০২৬