
নিউ জার্সি থেকে কংগ্রেসে প্রথম মুসলিম, গাজায় সেবা দেওয়া সার্জন আদম হামাওয়ি
ছবিঃ সংগৃহীত
নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নির্বাচিত হয়েছেন মিশরীয়-আমেরিকান সার্জন আদম হামাওয়ি। দেশজুড়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির অভাবনীয় সাফল্যের ধারায় আসা এই জয়ে ইতিহাসও গড়েছেন তিনি—নিউ জার্সির প্রতিনিধি হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে তিনিই প্রথম মুসলিম, প্রথম মিশরীয়-আমেরিকানও।
গত মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পর ভাষণে হামাওয়ি সরাসরি গাজাবাসীর উদ্দেশে বার্তা দেন। গাজা ও ফিলিস্তিনের পুরুষ, নারী ও শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের মুখের হাসিই তাঁকে একটি সুন্দর বিশ্ব গড়ার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস ও আশা জোগায়।
এমএস নাউ-এর প্রক্ষেপণ বলছে, প্রতিনিধি পরিষদে এত দিন ২১৮টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল রিপাবলিকানদের, ডেমোক্রেটিক পার্টির ছিল ২১৪টি। জানুয়ারিতে আদম হামাওয়িসহ বিজয়ী ডেমোক্র্যাটরা শপথ নিলে ২৫০টি আসন নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে যাচ্ছে ডেমোক্রেটিক পার্টি।
নিউ জার্সির প্রিন্সটনে হামাওয়ির নির্বাচনী ফল দেখার অনুষ্ঠানে ছিলেন মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিনিধি। সেখানে বিজয়ী বক্তৃতায় দেরি না করে কাজে নামার প্রস্তুতির কথা জানান হামাওয়ি, ঘোষণা দেন তিনি “ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবেন”। নিজেকে একজন সার্জন হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁরা এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে যাচ্ছেন। ওয়াশিংটনের এস্টাবলিশমেন্ট দীর্ঘকাল যে আমেরিকানদের পেছনে ফেলে রেখেছে, তাঁদের প্রত্যেকের অধিকারের জন্য লড়াই করবেন বলেও জানান তিনি।
এই নির্বাচনী উৎসবে দেখা গেছে নজিরবিহীন সংহতির ছবি। কংগ্রেসওম্যান বনি ওয়াটসন কোলম্যান কোলাকুলি করে হামাওয়িকে মঞ্চে ডেকে নেন এবং বিজয়ী ভাষণ দেওয়ার সুযোগ করে দেন। ‘জিউস ফর হামাওয়ি’ (হামাওয়ির পক্ষে ইহুদি সম্প্রদায়) লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস’-এর সদস্যরাও তাঁর জয়ে সংহতি জানান।
অথচ প্রচারণার দিনগুলোতে হামাওয়িকে যে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, উদযাপনের এই ছবি তার একেবারে উল্টো। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ করেন তিনি: জীবনে মুসলিমবিদ্বেষকে এতটা প্রকাশ্য, উচ্চকিত ও গ্রহণযোগ্য হতে কখনো দেখেননি, আর তা এখন শুধু নিউ জার্সিতে নয়, সারা দেশেই দেখা যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটা আগেও ছিল, তবে এখন প্রকাশ্য, সর্বজনীন ও ভীষণ হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে; তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও বন্ধুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, প্রশ্ন তোলা হয়েছে তাঁর আনুগত্য ও দেশপ্রেম নিয়েও।
এই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে হামাওয়ির ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান। তাঁর নির্বাচনী আয়োজনে কেফিয়াহ পরে, আমেরিকার পতাকা হাতে হাজির হন অসংখ্য সমর্থক। নিউ জার্সির ভোটার ইয়োশি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ফিলিস্তিন প্রশ্নে হামাওয়ির স্পষ্ট অবস্থান তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি জানান, হামাওয়ি যখন নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁকে ‘বোমা নয়, স্বাস্থ্যসেবা’ বার্তা ছড়াতে দেখে তাঁর মন ছুঁয়ে গিয়েছিল।
প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেছেন ইয়োশি। তাঁর চোখে এ জয় ফিলিস্তিনপন্থি সাধারণ মানুষের তৃণমূল আন্দোলনের জয়। তিনি বলেন, সংগঠিত সাধারণ মানুষ সত্যিই সংগঠিত অর্থকে হারাতে পারে; তাঁর অনেক সহ-স্বেচ্ছাসেবক এর আগে ‘আনকমিটেড নিউ জার্সি’ প্রচারণাতেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইয়োশি এবং তাঁর মতো অনেকের কাছে রাজনৈতিক যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রধান মাপকাঠি ছিল ফিলিস্তিন ইস্যু। তিনি আরও বলেন, তাঁদের কাজ এখনো শেষ হয়নি; ডক্টর আদম হামাওয়ির জয়ের পরদিন থেকেই শুরু হবে মূল কাজ, কারণ গাজা এখনো অবরুদ্ধ, সেখানে এখনো বোমা ফেলা হচ্ছে। নিজেদের করের টাকা আর যুদ্ধ ও গণহত্যার পেছনে খরচ হোক, তা তাঁরা চান না।
এসব ফিলিস্তিনপন্থি ও প্রগতিশীল অবস্থানের কারণেই প্রচারণার সময় প্রো-ইসরায়েল ও চরম ডানপন্থি গোষ্ঠীর তীব্র আক্রমণের শিকার হতে হয় হামাওয়িকে। প্রাইমারির আগে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেসব আক্রমণ হেসে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে অনেক কঠিন কাজ তিনি জীবনে করেছেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, তারা বড়জোর কী করবে—গালি দেবে, নাকি আক্রমণ করবে? এর চেয়ে অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতি ও দৃশ্য তিনি নিজের চোখে দেখেছেন।
প্রচারণা চলাকালে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক মতামত নিবন্ধে হামাওয়ির আদর্শের সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত মুসলিম ধর্মপ্রচারক ওমর আবদেল রহমানের (যিনি ‘ব্লাইন্ড শেখ’ নামে পরিচিত) মতাদর্শের যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করে। জাতিসংঘ সদর দফতরে তৎকালীন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারককে হত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে ১৯৯৫ সালে আবদেল রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়; মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বড় সন্ত্রাসবাদ মামলা। ২০১৭ সালে কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই বিচারে প্রায় ২০০ জন সাক্ষীর একজন ছিলেন আদম হামাওয়ি। জুরিদের সামনে সাক্ষ্যে তিনি জানিয়েছিলেন, ওই ধর্মপ্রচারক আমেরিকাবিরোধী মনোভাব প্রকাশ করলেও কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে হবে, সে বিষয়ে সরাসরি সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেননি।
প্রচারণার সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসা এই জয় সমর্থকদের মনে নতুন আশা জাগিয়েছে। নিউ জার্সি এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ন্যান্সি সেডলাক মিডল ইস্ট আইকে জানান, গত কয়েক বছরের নোংরা রাজনীতির পর এই ফল মার্কিন রাজনীতির ওপর তাঁর বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। তাঁর কথায়, অবশেষে তিনি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন; গত ১০টি বছর ছিল ভীষণ ভয়াবহ, আর এই জয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নতুন আশা তৈরি করেছে। প্রকাশ্য শিক্ষার প্রতি হামাওয়ির আন্তরিক সমর্থন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকারের কারণেই তাঁকে ভোট দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ সার্জন হামাওয়ির প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং সাধারণ কর্মজীবী মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। ‘বোমা নয়, স্বাস্থ্যসেবা’ স্লোগান সামনে রেখে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সবার জন্য সর্বজনীন চিকিৎসা (মেডিকেয়ার ফর অল), সাশ্রয়ী আবাসন ও শিক্ষা, অভিবাসী ও নাগরিক স্বাধীনতার শক্তিশালী সুরক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বদলে মানবাধিকারকেন্দ্রিক মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির।
মিশরীয় অভিবাসী মা-বাবার সন্তান আদম হামাওয়ি বড় হয়েছেন নিউ জার্সিতেই। দেশের সেবা আর নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি যোগ দেন নিউ জার্সি আর্মি ন্যাশনাল গার্ডে। চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষার্থী থাকাকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বসনিয়ায় জীবনের প্রথম মানবিক চিকিৎসা মিশনে যান। ২০০১ সালে নিউইয়র্কে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর গ্রাউন্ড জিরো থেকে উদ্ধার হওয়া আহতদের চিকিৎসায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি।
এর মাত্র তিন বছর পর মার্কিন সেনাবাহিনীতে কমব্যাট ট্রমা সার্জন হিসেবে যোগ দেন হামাওয়ি। ২০০৪ সালে ইরাক যুদ্ধে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে গুরুতর আহত হন ইলিনয়ের বর্তমান সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থ; তাঁর জীবন বাঁচিয়ে নজিরবিহীন অবদান রাখেন তিনি।
গত ৩০ বছর ধরে সুদান, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, তুরস্ক ও জর্ডানসহ বিশ্বের নানা যুদ্ধ ও দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসক হিসেবে নিরলস সেবা দিয়ে আসছেন হামাওয়ি। বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ে তিনি নিজে সেখানে থেকে মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়া চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের জীবন বাঁচাতে সামনের সারিতে কাজ করেন।
সূত্র: মিডলইস্ট আই
প্রেক্ষাপট
নিউ জার্সি মনিটরের ২০২৬ সালের ২ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবসরে যাওয়া প্রতিনিধি বনি ওয়াটসন কোলম্যানের আসনের জন্য ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে আরও ১১ জন ডেমোক্র্যাটের সঙ্গে লড়ে জয়ী হন হামাওয়ি। নির্বাচিত পদের জন্য সেটিই ছিল তাঁর প্রথম লড়াই।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রেক্ষাপট সূত্র: নিউ জার্সি মনিটর, ২ জুন ২০২৬
