
পাতাল মেট্রোরেলের চার প্যাকেজে চুক্তি: রামপুরা-নতুন বাজার ও নদ্দা-বিমানবন্দর অংশে হবে সুড়ঙ্গপথ
ছবিঃ সংগৃহীত
রাজধানীর গণপরিবহন নেটওয়ার্ক বাড়াতে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১-এর চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের নির্মাণ চুক্তি সই হয়েছে।
আজ বিকেলে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে এমআরটি লাইন-৬ ডিপো এলাকার মেট্রোরেল ভবনের সম্মেলনকক্ষে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চুক্তিগুলো সই হয়।
বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে চলমান দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পের অবকাঠামো উন্নয়নে চুক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি ও জাইকা বাংলাদেশ অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ তাকাহাশি জুনকো। স্বাগত বক্তব্য দেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, রাজধানীর যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় বাঁচানো এবং নাগরিকদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ জন্য মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণসহ নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও সময়োপযোগী নগর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহনে নতুন দিগন্ত খুলবে। এ প্রকল্পে জাপান সরকারের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা ও জাইকার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
চার প্যাকেজের চুক্তি সইকে এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নের তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক উল্লেখ করে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিনন্দন জানান সচিব। শ্রম আইনসহ দেশের প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইন মেনে নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিতের নির্দেশনাও দেন তিনি।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, নির্মাণকাজের কারণে সাধারণ মানুষের যে সাময়িক ভোগান্তি হবে, তা যাতে দীর্ঘায়িত না হয়, সে জন্য প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্মাণকাজে পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্প এলাকার আশপাশের বাসিন্দাদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সফল বাস্তবায়নের জন্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের মধ্যে স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও কার্যকর সমন্বয় এবং যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা ও উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশংসা করেন। মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের স্থবিরতা কাটিয়ে আবার বাস্তবায়ন শুরু ও গতিশীল করার উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে পাশে থাকতে আগ্রহী জাপান।
চার প্যাকেজে যেসব কাজ হবে
কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৪ (টানেল ও স্টেশন নির্মাণ): এমআরটি লাইন-১-এর রামপুরা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত মোট ৪ দশমিক ৪৪৭ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড রুট নির্মাণ করা হবে।
কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৬ (টানেল ও স্টেশন নির্মাণ): এমআরটি লাইন-১-এর নদ্দা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে এয়ারপোর্ট স্টেশন পর্যন্ত মোট ৫ দশমিক ১৮২ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড রুট নির্মাণ করা হবে।
কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৯ (ট্র্যাক ও ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম): এমআরটি লাইন-১-এর ট্র্যাক ওয়ার্কস (রেল, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিং ইত্যাদি) এবং ইলেকট্রিক্যাল ফ্যাসিলিটি বসানো হবে।
কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-১০ (সিগন্যালিং, টেলিকমিউনিকেশন, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর ও এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম): এমআরটি লাইন-১-এর সিগন্যালিং সিস্টেম (কমিউনিকেশন বেজড অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোলিং সিস্টেম), টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম (অপটিক্যাল ফাইবার বেজড ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ও এলটিই প্রযুক্তির রেডিও কমিউনিকেশন ব্যবস্থা), প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর এবং এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইআরএমএস) স্থাপন করা হবে।
চার প্যাকেজের কাজ শেষ হলে রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। ঢাকার ক্রমবর্ধমান যাতায়াত চাহিদা মেটানো, যানজটের চাপ কমানো এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন গড়ার উদ্যোগও এতে আরও এগোবে।
অনুষ্ঠানে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং চুক্তি সইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রেক্ষাপট
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১-এর মোট দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার যাবে মাটির নিচ দিয়ে, আর নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত প্রায় ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার মাটির ওপর দিয়ে। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি।
সংখ্যার হিসাব
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জানায়, প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, আর কাজ শেষের লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সাল।
ইত্তেফাকের ৩১ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)—এই দুই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাসস
প্রেক্ষাপট সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৭ এপ্রিল ২০২৫; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩; ইত্তেফাক, ৩১ আগস্ট ২০২৬
