গয়না ছেড়ে চিপ আর এআই সার্ভারে নজর চীনের কৃত্রিম হীরা উৎপাদকদের
ছবিঃ সংগৃহীত
দাম পড়ছে, প্রতিযোগিতাও তীব্র—এই চাপে চীনের কৃত্রিম হীরা উৎপাদকেরা গয়নার বাজারের বাইরে নতুন পথ খুঁজছেন। তাঁদের লক্ষ্য এখন সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সার্ভার আর অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির কাজে লাগে এমন উন্নত উপকরণ তৈরি। উৎপাদকদের বিশ্বাস, বিশাল এই শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু রত্নপাথরে আটকে নেই; প্রযুক্তি খাতেও বড় সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে।
ফেং ক্যানজুনের কারখানায় বছরে উৎপাদিত হয় ২০ লাখ ক্যারেট কৃত্রিম হীরা। এর প্রায় ৭০ শতাংশ এখন যায় গয়না তৈরিতে। তবে এই উদ্যোক্তার ধারণা, সামনের দিনে শিল্পটির প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে সেমিকন্ডাক্টর, এআই সার্ভারসহ উচ্চপ্রযুক্তির নানা কাজে ব্যবহারযোগ্য হীরা জোগানোর ওপর।
ফেংয়ের পরিকল্পনা, ২০৩০ সালের মধ্যে তাঁর কারখানার হীরার ৫০ শতাংশের বেশি যাবে কার্যকরী উপকরণ হিসেবে। একই সময়ের মধ্যে গয়নায় ব্যবহৃত হীরার অংশ ৩০ শতাংশের নিচে নামাতে চান তিনি।
বিশ্বে মোট যত কৃত্রিম হীরা সরবরাহ হয়, তার প্রায় অর্ধেক আসে চীন থেকে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির উৎপাদকেরা গয়না, কাটিং ও ড্রিলিংয়ের কাজের জন্য হীরা বানিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রতিযোগিতা বাড়া আর দাম পড়ে যাওয়ায় তাঁরা এখন বেশি মূল্য সংযোজনের সুযোগ আছে এমন প্রযুক্তিনির্ভর বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
এই মোড় বদল চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর ও এআই অবকাঠামোর তাপ নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম হীরার ব্যবহার বাড়লে উৎপাদনে চীনের আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহব্যবস্থার জন্য কৌশলগত দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেন রিসার্চের এনগেজমেন্ট ম্যানেজার মানন গোয়েঙ্কার মতে, হীরা শিল্পের এই রূপান্তর কাঠামোগত পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায়।
বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, চিপ, তাপ নিয়ন্ত্রণ ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো খাতে চাহিদা বাড়লে কৃত্রিম হীরা শিল্পে প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। হীরার কিছু বিশেষ ভৌত গুণ উন্নত ইলেকট্রনিকস ও কম্পিউটিং ব্যবস্থার কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে উচ্চক্ষমতার যন্ত্রে তৈরি হওয়া তাপ দ্রুত সরাতে কৃত্রিম হীরা গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
পরিবর্তনটা ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন এআইয়ের বিস্তারে ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ জাপানের এক বছরের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় সমান। বিদ্যুতের এই বাড়তি চাহিদার অন্যতম প্রধান কারণ এআইয়ের ব্যবহার বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, তাপ নিয়ন্ত্রণের কাজে কৃত্রিম হীরা অদূর ভবিষ্যতেই বড় বাজার তৈরি করতে পারে। তবে সেমিকন্ডাক্টর তৈরির মূল উপকরণ হিসেবে হীরার ব্যাপক বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনো অনেক দূরের ব্যাপার। চিপ তৈরিতে লাগলে হীরাকে হতে হয় অত্যন্ত বিশুদ্ধ, উৎপাদনের মানদণ্ডও অনেক কড়া। কাটিং ও ড্রিলিংয়ের হীরার ক্ষেত্রে সেই শর্ত তুলনামূলক নরম।
বিশ্বের কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ অবশ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামনে চিপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রে কৃত্রিম হীরার নতুন চাহিদা তৈরি হতে পারে। এআই কম্পিউটিং যত ছড়াচ্ছে, যন্ত্রে তাপও তত বাড়ছে। ফলে চিপ ও সার্ভারের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে উন্নত শীতলীকরণ প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে।
চীনের সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, চিপ ঠান্ডা রাখতে কৃত্রিম হীরার ব্যবহার নিয়ে খোঁজখবর করছে হুয়াওয়ে ও তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি)। লেনোভো জানিয়েছে, চীনের বাজারে তারা এমন একটি ভোক্তা ল্যাপটপ এনেছে, যার শীতলীকরণ ব্যবস্থায় হীরা ও তামা মিশিয়ে তৈরি উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।
গত জুনে ইন্টেলের প্রধান নির্বাহী লিপ-বু ট্যান জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ডায়মন্ড ফাউন্ড্রিতে বিনিয়োগ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি চিপ তৈরির উপযোগী হীরার ওয়েফার বানানো নিয়ে কাজ করছে। এ উদ্যোগ বলছে, কৃত্রিম হীরার সম্ভাবনা শুধু যন্ত্র ঠান্ডা রাখায় সীমিত নয়; একসময় চিপ তৈরির উপকরণ হিসেবেও এটি জায়গা করে নিতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে হুয়াওয়ে, লেনোভো ও ইন্টেল সাড়া দেয়নি। টিএসএমসি মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
প্রযুক্তি খাতে চাহিদা বাড়বে—এমন আশায় চীনের কয়েকটি উৎপাদক এর মধ্যেই বিনিয়োগের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। জুনে জমা দেওয়া এক নথি অনুযায়ী, হীরা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আগে তোলা তহবিলের ১০০ কোটি ইউয়ান একটি নতুন কার্যকরী হীরা প্রকল্পে খাটানোর পরিকল্পনা করেছে হেনান লিলিয়াং।
চীনের কৃত্রিম হীরা শিল্পের এই রূপান্তর তাই কেবল নতুন বাজার খোঁজা নয়, উচ্চপ্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থায় বড় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টাও। তবে গয়নার বাজার থেকে সরে প্রযুক্তি খাতে বড় অংশীদার হতে হলে উৎপাদকদের হীরার বিশুদ্ধতা, উৎপাদনের মান আর প্রতিযোগিতামূলক দামে জোগানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব বাধা পেরোতে পারলে গয়নার জন্য পরিচিত কৃত্রিম হীরাই একদিন এআই ও চিপশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রেক্ষাপট
চায়না সুপারহার্ড ম্যাটেরিয়াল (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডায়মন্ড) অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, চীনের মোট কৃত্রিম হীরা উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ হয় হেনান প্রদেশে — হেনান প্রাদেশিক সরকারের ইংরেজি পোর্টাল ২০২৪ সালের ৪ জুন এ তথ্য জানিয়েছে।
একই সংগঠনের ২০২৪ সালের হিসাবে, বিশ্বের ল্যাবে তৈরি হীরার প্রায় ৯৫ শতাংশ চীনে উৎপাদিত হয়; মূল প্রতিবেদনের ‘প্রায় অর্ধেক’ হিসাবের সঙ্গে সূত্রভেদে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
সংখ্যার হিসাব
জুয়েলারি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান টেনোরিসের হিসাবে, ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে খোলা বাজারে ল্যাবে তৈরি হীরার দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমেছিল — বিজনেস ইনসাইডার ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
বেইন অ্যান্ড কোম্পানির হিসাবে, এক দশকে ল্যাবে হীরা তৈরির খরচ প্রতি ক্যারেটে প্রায় ৪ হাজার ডলার থেকে কমে ৩০০ ডলারে নেমেছিল — ২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর ফ্যাশন নেটওয়ার্কে প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য রয়েছে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: আজকের পত্রিকা
প্রেক্ষাপট সূত্র: হেনান প্রাদেশিক সরকারের ইংরেজি পোর্টাল, ৪ জুন ২০২৪; বিজনেস ইনসাইডার (এওএল), ফেব্রুয়ারি ২০২৪; ফ্যাশন নেটওয়ার্ক (রয়টার্স), ২১ ডিসেম্বর ২০১৮