পোশাকের বাইরে রপ্তানি বাড়াতে ইপিবির সংলাপ, যুক্তরাজ্যের ডিসিটিএস সুবিধা পুরো কাজে লাগানোর উদ্যোগ
ছবিঃ সংগৃহীত
তৈরি পোশাকের (আরএমজি) বাইরে রপ্তানিপণ্যে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা জোরদার করছে বাংলাদেশ, সেই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা যতটা সম্ভব কাজে লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাজারের শর্তমতো পণ্যের মান ও নিয়মকানুন মেনে চলার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল সোর্সিং ডায়ালগ’ নামে একটি আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে এ বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পায়। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চেম্বার, ক্রেতা ফোরাম ও বিদেশি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে যোগ দেন।
যুক্তরাজ্যের ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম’ (ডিসিটিএস) কী সুবিধা দেয়, তা ব্যাখ্যা করেন ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের উন্নয়নবিষয়ক কাউন্সেলর ও উপ-উন্নয়ন পরিচালক মার্টিন ডসন। তাঁর মতে, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলো এই স্কিমে থাকা বাণিজ্যসুবিধার পুরোটা এখনো কাজে লাগাতে পারেনি।
দেশে কাজ করা স্থানীয় ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও সোর্সিং এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি। এতে বাংলাদেশি উৎপাদকেরা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেন এই কূটনীতিক।
ডিসিটিএস নিয়ে রপ্তানিকারকদের জানাশোনা বাড়াতে ইপিবি ও ব্রিটিশ হাইকমিশন একসঙ্গে কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। স্কিমটির সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা কী এবং নিয়মকানুন কীভাবে মানতে হয়—এসব নিয়ে প্রশিক্ষণও এর অংশ।
অশুল্ক বাধা সামলানো এবং অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামে এবং তৈরি পোশাক খাতের জন্য আরও কর্মশালা করার পরিকল্পনা আছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিপণ্যের বৈচিত্র্য ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর বড় পরিসরের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রপ্তানি খাতের সংখ্যা আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টিতে উন্নীত করেছে ইপিবি। নতুন সম্ভাবনাময় শিল্প ও সেবা খাত বিস্তারের সুযোগও যাচাই করা হচ্ছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, শিল্প খাতের চাহিদা বিবেচনায় পরের দফায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের তালিকায় স্বাস্থ্যসেবার মতো সেবা খাত যুক্ত করার কথা ভাবা যেতে পারে।
বাজারে ঢোকার সুযোগকে কার্যকর রপ্তানি আদেশে রূপ দিতে হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ডিং এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ খুবই জরুরি—আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এমন মত দেন।
প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি উদীয়মান অপ্রচলিত রপ্তানিপণ্যের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।
পরিবেশে সহজে পচে যায় এমন প্যাকেজিং সামগ্রীর চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে। এতে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আলোচনায় বলা হয়।
ইন্দোনেশিয়ায় পাটের সুতা, পাটের বস্তা, তামাক, তৈরি পোশাক ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানির সম্ভাবনার কথা জানান ইন্দোনেশিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি।
সভায় তুলে ধরা তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশ ২০ লাখ মার্কিন ডলারের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রপ্তানি করেছে।
সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার নিরাপত্তার মতো উচ্চমূল্যের খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ নিয়েও কথা হয়।
সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক প্রতিনিধি এসব খাতের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, বিমান পরিবহন ও আতিথেয়তা শিল্পেও বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে জোর
বাণিজ্য মেলায় উৎপাদক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা যাতে সরাসরি ব্যবসায়িক আলাপের সুযোগ পান, তা বাড়ানো দরকার বলে মত দেন আলোচকেরা।
২০১৫ সালে টোকিওর একটি বাণিজ্য মেলার অভিজ্ঞতা শোনান হাসান আরিফ। তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতারা যেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারেন, সে সুযোগ রাখা জরুরি।
বিদেশি সোর্সিং প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সামনে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরতে ছোট প্রচারচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট আর বাণিজ্য মেলার সরাসরি ভিডিও ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
অন্য দেশের বাজারেও রপ্তানি বাড়ানোর পথ খুঁজছে বাংলাদেশ। ব্রাজিল-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির এক প্রতিনিধি জানান, রিও ডি জেনেইরোতে বাণিজ্য প্রচারের পর আগামী ২২ থেকে ২৫ মার্চ সাও পাওলোতে হবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ এক্সপো’।
বাংলাদেশের ১৪টি কোম্পানিকে নিয়ে সম্প্রতি একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সফরের কথা তুলে ধরেন ইতালিয়ান ট্রেড এজেন্সির একজন প্রতিনিধি। ইউরোপের বড় বাজারে বাংলাদেশি পণ্য ঢোকার সম্ভাব্য প্রবেশপথ হিসেবে কসোভোর প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে।
‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো ঢাকা ২০২৬’ সফল করতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট বাইং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের টানতে অডিওভিজ্যুয়াল প্রামাণ্যচিত্র এবং আয়োজনের সরাসরি ভিডিওচিত্র তৈরির প্রস্তাবও দেন তাঁরা।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যানের সমাপনী বক্তব্যে সভার আনুষ্ঠানিক অংশ শেষ হয়। এরপর অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে নেটওয়ার্কিং অধিবেশন হয়।
যুক্তরাজ্যের শুল্কসুবিধার কার্যকর ব্যবহার, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচার—এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়বে এবং রপ্তানির ভিত আরও স্থিতিশীল হবে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
এক নজরে
ডিসিটিএস চালুর সময় ব্রিটিশ হাইকমিশন জানিয়েছিল, স্কিমটির আওতায় বাংলাদেশসহ ৬৫টি উন্নয়নশীল দেশ রয়েছে এবং তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ রপ্তানিপণ্য যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে — প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণ ২০২৩ সালের ১৯ জুন এ তথ্য জানিয়েছিল।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কিছু শর্ত পূরণ করলে ৯৫টি দেশের কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পণ্যও বাংলাদেশ শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাজ্যে পাঠাতে পারবে।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রেক্ষাপট সূত্র: প্রথম আলো (ইংরেজি), ১৯ জুন ২০২৩