‘এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়’: আলেমদের অভিজ্ঞতায় আমল ও সুন্নাহর বাস্তব ফল
ছবিঃ সংগৃহীত
মানুষের জীবনের প্রতিটি দিকের জন্য পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ নিয়ে এসেছে ইসলামী শরিয়ত—এটাই এর অন্যতম সৌন্দর্য। ইসলাম মানুষের অন্তর শুদ্ধ করে, আচরণকে ঠিক পথে চালায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভের রাস্তা দেখায়।
শরিয়তের বিধানগুলো নিছক তত্ত্বকথা বা বিমূর্ত উপদেশ নয়; জীবনে এগুলোর বাস্তব প্রভাব ও ফল রয়েছে। মানুষের প্রতিদিনের জীবন সেই প্রভাবের সাক্ষী, অভিজ্ঞতা তাকে সত্য বলে প্রমাণ করে, আর যুগে যুগে আলেমদের আমল ও পর্যবেক্ষণও একই কথা বলে।
আলেমদের লেখায় বারবার কিছু বাক্য চোখে পড়ে—‘এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়’; ‘এটি একটি প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয়’; ‘এটি একটি পরীক্ষিত ও প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয়’। কথাগুলোর অর্থ অনেক গভীর।
এসব বাক্য ওহির নির্দেশনা, শরিয়তের সঠিক বোঝাপড়া আর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার যোগসূত্র দেখিয়ে দেয়। এখানে কেবল আন্দাজনির্ভর অভিজ্ঞতার কথা বলা হচ্ছে না; শরিয়তের শিক্ষা বুঝে জীবনে মেনে চলার মধ্য দিয়ে তার প্রভাব নিজের চোখে দেখার কথা বলা হচ্ছে।
আগের ও পরের যুগের বহু আলেম নানা বিষয়ে এই মূলনীতির কথা বলেছেন—নামাজ, ইবাদত, দাওয়াত, চরিত্র গঠন, কোমল ব্যবহার, দান-সদকা, তাওবা ও শরিয়তসম্মত চিকিৎসা তার মধ্যে আছে। তাঁদের বক্তব্যের সারকথা হলো, শরিয়ত যে কল্যাণের দিকে ডাকে, আন্তরিকতা নিয়ে ঠিকভাবে মেনে চললে মানুষ তার অনেক প্রভাব নিজের জীবনেই টের পায়।
এ বিষয়ে কয়েকজন আলেমের বক্তব্য এবং সেগুলোর শিক্ষা নিচে দেওয়া হলো—
নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর মতে, নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে—মানুষ এটা নিজের ভেতরেই অনুভব করতে পারে। আবার যারা অনর্থক বিনোদন ও প্রবৃত্তির পেছনে ডুবে থাকে, তাদের অন্তর অনেক সময় অশ্লীলতা ও অন্যায়ের দিকে হেলে পড়ে। (আল-ইস্তিকামাহ : ১/৩১৮-৩১৯)
সুন্নাহ ছেড়ে দিলে কল্যাণ হারানোর আশঙ্কা
ইবনুল হাজ্জ (রহ.) লিখেছেন, ঠিকমতো জ্ঞান অর্জন না করেই কেউ যখন আলেমের বাহ্যিক বেশ ধারণ করে, তখন মানুষ তাকে আলেম ভেবে নানা মাসআলা জিজ্ঞেস করতে পারে। নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে লজ্জা পেয়ে সে তখন ভুল ফতোয়া দিয়ে বসতে পারে।
এতে সে নিজে যেমন বিপদে পড়ে, তেমনি অন্যদেরও বিভ্রান্ত করে। এ প্রসঙ্গে তাঁর পর্যবেক্ষণ, আলেমদের কাছে এটি পরীক্ষিত ও সুপরিচিত বিষয় যে কোনো ক্ষেত্রে সুন্নাহ বাদ দেওয়া হলে তার জায়গায় যা-ই করা হোক না কেন, তাতে কল্যাণের ঘাটতি থেকে যায়। (আল-মাদখাল, ইবনুল হাজ্জ : ১/১৩৬-১৩৭)
ইবাদতে শরীর কর্মঠ থাকে
হাফিজ ইবনু কাসির (রহ.)-এর ভাষ্য, ইবাদত শরীরকে কর্মঠ ও কোমল রাখে আর অতিরিক্ত ঘুম শরীরে আলস্য ও কঠোরতা আনে—এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৯/৩২২)
শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ ও আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়া
জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার প্রসঙ্গে শাইখ আবদুল আজিজ ইবনু বাজ (রহ.) কোরআন তিলাওয়াত, পানিতে কোরআন পড়ে সেই পানি পান করা এবং তা দিয়ে গোসল করার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সবুজ সিদরের সাতটি পাতা পানিতে দিয়ে পিষে ব্যবহার করাও আল্লাহর ইচ্ছায় উপকারে আসতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়া ও তাঁর ওপর ভরসা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত আরোগ্যদাতা আল্লাহ তাআলাই। (ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব, ইবনু বায, শুওয়াইয়ির সম্পাদিত : ৩/৩৭৫)
জাদুকর ও গণকের কাছে না গিয়ে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ ও দোয়ার মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া উচিত বলেও মত দেন তিনি। তাঁর কথায়, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর অনুমতিতে ক্ষতি দূর হতে পারে।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান অন্তরকে প্রশস্ত করে
শাইখ মুহাম্মদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমিন (রহ.)-এর মতে, আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার উদ্দেশ্যে দান করলে মানুষের অন্তর প্রশস্ত হয়, মন খুশি থাকে, হৃদয়ে শান্তি আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৬২, তাফসির : সুরা আল-বাকারাহ, ইবনু উসাইমিন : ৩/৩৭৩)
তিনি আরও বলেন, মানুষ যখন আন্তরিকভাবে নিজের সম্পদ খরচ করে—বিশেষ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য—তখন নিজের ভেতরে প্রশান্তি অনুভব করে। (আশ-শারহুল মুমতি : ৬/৮; শারহ রিয়াদিস সালিহিন : ৫/২৩৭)
ঈমান ও তাওহিদে মনের নিরাপত্তা ও স্থিরতা
শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান যার যত বেশি এবং তাওহিদে যে যত দৃঢ়, সে তত বেশি নিরাপত্তা ও স্থিরতা পায়। এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়। (তাফসির আল-উসাইমিন, সুরা আলে ইমরান : ২/৩০১)
ধৈর্য খুলে দেয় অশেষ কল্যাণের দরজা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা আয-যুমার, আয়াত : ১০)
ইবনু উসাইমিনের ব্যাখ্যায়, ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা যুক্ত হলে সেটি ভালো পরিণতি ও সওয়াবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (তাফসির আল-উসাইমিন, সুরা আলে ইমরান : ২/৬০১-৬০২)
ঈমান যত মজবুত, আনুগত্য তত সহজ
ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন, ঈমান মানুষকে আল্লাহর আদেশ মানতে এবং নিষেধ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহ দেয়। ঈমানের জোর যত বাড়ে, আনুগত্যের আগ্রহও তত বাড়ে।
তাঁর ব্যাখ্যা, মানুষ এই পার্থক্য নিজের মধ্যেই টের পায়: কখনো অন্তরে ঈমানের শক্তি টের পাওয়া যায় এবং ইবাদতে ভালো লাগে, আবার কখনো আলস্য ভর করে আর ইবাদত কঠিন মনে হয়। (তাফসির আল-উসাইমিন, সুরা আল-মায়িদা : ১/৩৩৩)
উপেক্ষায় কমে বিবাদ
ইবনু উসাইমিন (রহ.)-এর পরামর্শ, অন্যের প্রতিটি কথাকে তার বিরুদ্ধে বিচারের মাপকাঠি বানানো ঠিক নয়; অনেক সময় ক্ষমা, উপেক্ষা ও নীরবতাই ভালো। তিনি বুঝিয়েছেন, গালির জবাবে গালি দিলে ঝগড়া লম্বা হতে পারে, শত্রুতা আর বিদ্বেষ বাড়তে পারে; কিন্তু নিজেকে সামলে চুপ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়। (শারহ রিয়াদিস সালিহিন : ৪/২৯৭)
উপহারে বাড়ে ভালোবাসা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরকে উপহার দাও, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ)
এ প্রসঙ্গে ইবনু উসাইমিন (রহ.)-এর মন্তব্য: ‘এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়।’ (শারহুল আকিদাতিস সাফারিনিয়্যাহ : ১/৬০২)
সবশেষে বলা যায়, আল্লাহর আনুগত্য, সুন্নাহর অনুসরণ ও সুন্দর চরিত্র মানুষের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনার বড় মাধ্যম। যিনি আন্তরিকভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি চান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হেদায়েত মেনে চলেন, তিনি দুনিয়াতেই বহু কল্যাণের ছোঁয়া অনুভব করতে পারেন এবং আখিরাতের প্রতিদানের আশা রাখতে পারেন।
সূত্র
মূল প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন